আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মৌলিক প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহমদ (জন্ম ১০ জুন ১৯১৮, মৃত্যু ১৯ অক্টোবর ১৯৭৪)। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের উজ্জ্বলতম কবি প্রতিভা হিসাবে তিনি সর্বজন স্বীকৃত। বিস্ময়ের বিষয় হলেও সত্য যে, ফররুখ আহমদ রচিত অর্ধশতাধিক গ্রন্থের মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকটি গ্রন্থই তাঁর জীবনকালে প্রকাশিত হয়। অথচ বেঁচে থাকতেই কবি অসাম্যান্য কবি-খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর কাব্য প্রকাশে আগ্রহী প্রকাশকের সংখ্যাও কম ছিল না। এতৎসত্ত্বেও জীবনকালে তাঁর অধিকাংশ রচনাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। এমনকি, যে কয়টি গ্রন্থ তাঁর জীবনকালে প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে বেশ কয়টি গ্রন্থের সকল কপিই সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পুনঃমুদ্রণের ব্যাপারে তাঁর তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় নি। এর মূলে সম্ভাব্য যেসব কারণ বিদ্যমান ছিল তা নি¤œরূপ ঃ
প্রথমত, ফররুখ আহমদ স্বভাবগতভাবে ছিলেন প্রচার-বিমুখ। সৃষ্টি-কর্মে তিনি গভীরভাবে নিষ্ঠাবান হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিতান্ত নিস্পৃহ। এমনকি, দারিদ্র্য-পীড়িত, দুঃসহ দুঃখ-কষ্টের জীবনে আকর্ষণীয় পরিমাণ অর্থ-বৈভবের লোভও তাঁকে কখনো কোন প্রকার প্রচার-কর্মে নিয়োজিত করতে পারেনি। জাগতিক কোন লোভ-লালসা তাঁকে তাঁর নীতি ও আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি। সৃষ্টি-কর্মে তিনি যেমন ছিলেন নিরলস সাধক, জাগতিক ব্যাপারে তিনি তেমনি ছিলেন অতিশয় নির্লোভ, নিঃস্বার্থ ও বিস্ময়কর রকম সাধু প্রকৃতির। তিনি মনে করতেন, প্রচারমুখিতা লেখকের সৃষ্টিশীলতা বিনাশ করে। এজন্য সাধারণত তিনি কোন সভা-সেমিনারে যেতেন না। কোথাও কখনো কোন অনুষ্ঠানে গেলেও শেষের অথবা মাঝখানের কোন সারিতে বসে নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করতেন। আত্ম-প্রচারে যথার্থ অনীহা তাঁর মহৎ শিল্প-স্বভাবের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে কোন একটি লেখা শেষ হলেই তা প্রকাশের জন্য পত্রিকা অফিসে ধর্ণা দেয়া অথবা একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেই তা প্রকাশের জন্য প্রকাশকের নিকট গিয়ে সাধাসাধি করা ফররুখের স্বভাবের মধ্যে ছিল না। তোয়াজ, তোষামোদ, চাটুকারিতা এগুলোর প্রতি ফররুখের চরম অনীহার কথা সর্বজনবিদিত। তিনি নিজে তো এগুলো অপছন্দ করতেনই, তাঁর কাছে কেউ এ রকম করলেও তিনি তাঁর উপর অসম্ভব রকম ক্ষেপে যেতেন। তিনি ছিলেন কঠোর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মহৎ শিল্পী, যিনি চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূল অবস্থায়ও কখনো কোন ব্যাপারে এতটুকু মাথা নত করতে বা আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে জানতেন না। সব সময় আরবি আলিফ হরফের মত শিরদাড়া খাড়া রেখে চলতে অভ্যস্থ ছিলেন। এক্ষেত্রে আমাদের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর বই-পুস্তক বেশী প্রকাশিত না হবার পেছনে এটা ছিল অন্যতম কারণ। তাঁর এ প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ বা আত্ম-সচেনতা আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে এক অনুসরণযোগ্য বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এজন্য দলমতনির্বিশেষে তিনি সকলের শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্য-কর্মে তিনি গভীর অনুশীলনের পক্ষপাতী ছিলেন। সাহিত্যের বিভিন্ন রূপরীতি ও শিল্প-সৌষ্ঠব সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কবিতার ভাব, ভাষা, বিষয়-বৈভব, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, আবেদন সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর শিল্প-সচেতন সংবেদনা ছিল অপরিসীম। তাই কোন কিছু লেখার পর সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশের জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়তেন না। প্রায়ই তিনি তা সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজন ও নানারূপ অনুশীলনের প্রয়াস পেয়েছেন। স্বীয় প্রতিভার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও প্রখর শিল্প-সচেতনতা তাঁকে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করেছে স্বীয় সৃষ্টিকর্মকে তিল তিল করে সুসম্পন্ন ও নিখুঁত করে তোলার কাজে। অতুলনীয় অমর সৃষ্টির দিকেই কবির দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। এ নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুশীলন ও কবি-মনের সহজাত অতৃপ্তিই তাঁর কাব্য প্রকাশে অনেক সময় তাঁকে বিরত রেখেছে। তাঁর প্রতিটি লেখা ও গ্রন্থেই গভীর অনুশীলন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বসম্পাদনার লক্ষণ স্পষ্ট। তাঁর ইন্তিকালের পর স্বহস্তে লেখা তাঁর যেসব পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে তা থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন কিছু লেখার পর তিনি সেটা প্রায়ই বার বার কাটাছাটা করেছেন।
মূলত তাঁর সব লেখাই স্বসম্পাদিত। আর উৎকৃষ্ট শিল্পজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই পারেন নিজের লেখার সম্পাদনা করতে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উন্নতমানের সাহিত্য পাঠের ফলেই তাঁর মধ্যে এ শিল্প-সচেতনতার জন্ম হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য প্রকৃতপক্ষে তার স্রষ্টার দ্বারা স্বসম্পাদিত। এ সম্পাদনার যোগ্যতা যার যত বেশি তিনি তত সফল। ফররুখ আহ্মদের মধ্যে এ পরিশীলিত উন্নত শিল্পবোধ থাকার কারণেই তাঁর লেখা প্রকাশে তিনি তাড়াহুড়া করতেন না। গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তৈরিতে তিনি প্রথমে নাম নির্বাচন, পরিকল্পিত গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতার তালিকা তৈরি, সে তালিকা বার বার কাট-ছাট, গ্রহণ-বর্জন ইত্যাদি নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত চিন্তাভাবনা করতেন। এসব ব্যাপারে তাঁর তেমন কোন তাড়াহুড়া ছিল না। এটা প্রকৃতই একজন সাধক শিল্পীর অনন্য বৈশিষ্ট্য। ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে এধরনের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
তৃতীয়ত, অধিকাংশ পেশাদার প্রকাশকদের প্রতি কবির বড় একটা আস্থা ছিল না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের প্রকাশকদের অনেকের মধ্যে সততার নিদারুণ অভাব। লেখকদেরকে নামমাত্র পয়সা দিয়ে অথবা না দিয়ে প্রকাশকরা পর্যাপ্ত বিত্ত-বৈভব এমনকি প্রচুর সুনাম-সুখ্যাতিরও অধিকারী হয়েছেন। লেখকরা সাধারণত গরিব, সংগতিপন্ন লেখকের সংখ্যা আমাদের দেশে খুবই কম। তাই অধিকাংশ প্রকাশক লেখকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানাভাবে তাদেরকে প্রতারিত করে থাকে। এরূপ বহু দৃষ্টান্তই ফররুখ আহমদের সামনে ছিল। ফররুখ আহমদ এরূপ নীতিহীন প্রকাশকদেরকে সযতেœ এড়িয়ে চলতেন। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে ফররুখ আহমদ প্রকাশকদের সম্পর্কে খুব একটা ভাল ধারণা পোষণ করতেন না। চিরকাল চরম দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে বলে তাঁর নিজের পক্ষেও গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর জীবনকালে দু’একজন সৎ প্রকাশক এবং বাংলা একাডেমীর মাধ্যমে তাঁর স্বল্পসংখ্যক গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তাঁর লেখা অধিকাংশ পান্ডুলিপিই অপ্রকাশিত থেকে যায়।
এ প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা যায়। ষাটের দশকের শেষের দিকে ঢাকায় ‘জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো’ বা ‘ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকন্সস্ট্রাকশন’ (বিএনআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডক্টর হাসান জামান এর পরিচালক ছিলেন। ডক্টর হাসান জামান কবি ফররুখ আহমদের আত্মীয় (ভাগিনেয়) ছিলেন। তিনি প্রকাশনা ক্ষেত্রে বলতে গেলে একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। অসংখ্য নবীন-প্রবীণ লেখকের প্রচুর বইপুস্তক ছেপে আমাদের জ্ঞানের জগৎ ও সাহিত্যের ভাণ্ডারকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, দলমতনির্বিশেষে সকল লেখকদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদানেও তেমনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। বলতে গেলে, তৎকালে আমাদের দেশের অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক-লেখক বিএনআর এবং ডক্টর হাসান জামানের কল্যাণে আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন। সর্বোপরি, যাঁদের নিজেদের বইপুস্তক প্রকাশের সামর্থ্য ছিল না, প্রকাশকদের সুদৃষ্টি লাভেও যাঁরা সক্ষম ছিলেন না, বিএনআর-এর মাধ্যমে রাতারাতি তাঁদের একাধিক বইপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত অর্থকষ্টে বিব্রত অসহায় দরিদ্র লেখকদের পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিয়ে তিনি তার বিনিময়ে তাদের অর্থকষ্ট দূর করতে সদা আগ্রহী ছিলেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ডক্টর হাসান জামান এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। কিন্তু ফররুখ আহমদ ছিলেন এক্ষেত্রেও এক বিরল ব্যতিক্রম। কেন, সে প্রসঙ্গেই বলছি।
ডক্টর হাসান জামান কবি ফররুখ আহমদের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থাদি প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে স্বয়ং কবির বাসায় এসেছেন একাধিক বার। এজন্য তাঁকে এক লক্ষ টাকা অগ্রিম রয়্যালটি প্রদানের প্রস্তাবও দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিবারই কবি দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশে সরকারী সহযোগিতা অপরিহার্য জ্ঞান করা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার নীতিকে কবি আন্তরিকভাবে অপছন্দ করতেন। কারণ, তাতে এক ধরনের রেজিমেন্টশন বা প্রতিক্রিয়াশীলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিএনআর তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত আগ্রহে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও ডক্টর হাসান জামান সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবেই ব্যুরোর কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন, তবু এ ধারণা তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহলে অনেকটা দানা বেঁধে উঠেছিল যে, মৌলিক গণতন্ত্রের দ্বারা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার মত বিএনআর-এরদ্বারা সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পকলার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীন বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কবি এ ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ও নীতিবোধের কারণে তিনি এ ধরনের বিতর্কিত বিষয়ের সাথে নিজেকে জড়াতে চাননি। মনে পড়ে, কবি এ প্রসঙ্গে একদিন তাঁর বৈঠকখানায় আলোচনা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন, “বিএনআর-এর পক্ষ থেকে গ্রন্থ প্রকাশ করে নিজেকে একজন ‘সরকারি কবি’ হিসাবে পরিচিত হতে দিতে চাই না। আমি চিরকালই স্বাধীনচেতা এবং সাধারণের একজন হয়ে আত্মপ্রকাশের প্রবল তাড়নায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্য-চর্চা করেছি, আমরণ আমি তাই করে যেতে চাই।”
এ কারণেই বিএনআর-এর পক্ষ থেকে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশ এবং তার বিনিময়ে এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থপ্রাপ্তির প্রস্তাবকে তিনি নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেন। ভাবতে বিস্ময় লাগে যে, পৃথিবীতে মাথা গুঁজবার মত এতটুকু ঠাঁই যার ছিল না, দিনান্ত অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে মাসান্তে যে নগণ্য পরিমাণ বেতন আসতো, তা দিয়ে কায়ক্লেশে তেরো সদস্যের বৃহৎ পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করাই যাঁর পক্ষে কঠিন ছিল, সে দারিদ্র্য-পীড়িত দুর্বহ জীবনে বিপুল অর্থ-প্রাপ্তির সহজ সুযোগও তাঁকে তাঁর প্রবল নীতিবোধ থেকে এতটুকু বিচ্যুত করতে পারেনি। অথচ নীতিবোধের ক্ষেত্রে এটা খুব যে একটা বড় সমস্যা ছিল তাও নয়। বিএনআর তখন আমাদের দেশেরই অন্যতম জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের তথা সরকারের অর্থে তা পরিচালিত হতো। দলমত-নির্বিশেষে পরিচিত, অপরিচিত, স্বল্প পরিচিত, সুপরিচিত প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিকই অর্থের প্রয়োজনে হোক, অথবা নিজেদের গ্রন্থ প্রকাশের তাগিদে হোক, তখন বিএনআর-এর নিকট গিয়ে ধর্ণা দিয়েছেন। বিএনআর-এর পরিচালক ডক্টর হাসান জামান এমনই উদার প্রকৃতির মহৎ পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যে, পাণ্ডুলিপি জমা নিয়ে প্রথমেই তিনি তার উপর বিল করে লেখকের রয়্যালটির টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করতেন, তারপর বই প্রকাশের ব্যবস্থা নিতেন। অনেক সময় অনেক গরিব-দুস্থ লেখককে তাঁর দুরবস্থার কথা শুনে অভিভূত হয়ে তাঁকে অগ্রিম টাকা দিয়ে ব্যুরোতে পরে তাঁকে তাঁর কোন একটি পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বলতেন। এরূপ দৃষ্টান্তও আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। এভাবে অনেক গরিব দুঃস্থ লেখক তাঁদের সাময়িক অভাব-অনটন, ঋণ পরিশোধের দুঃসহ চিন্তা, রোগাবস্থায় চিকিৎসা, কন্যাদায়ের ভাবনা থেকে বহুলাংশে নিষ্কৃতি পেয়েছেন। আমাদের দেশে এ ধরনের কোন কিছু কল্পনাও করা যায় না। এখানে বহু সাধনার পর বই লিখে লেখক দিনের পর দিন বিভিন্ন প্রকাশকের নিকট ধর্ণা দিয়েও বই প্রকাশের সুযোগ পান না। ভাগ্যক্রমে কেউ কখনো সুযোগ পেলেও রয়্যালটির টাকা পেতে হয়রান-পেরেশানীর শেষ থাকে না। ফলে তার লেখার উৎসাহটাই নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ডক্টর হাসান জামান যে এক বিরল ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের প্রকাশনা-শিল্পে এটা ছিল এক অভূতপূর্ব বিপ্লবাত্মক ঘটনা।
এসব প্রশংসনীয় দিক থাকা সত্ত্বেও, জাতীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ বাংলা একাডেমীকে প্রকারান্তরে উপেক্ষা করে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বিএনআর গঠন এবং আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে সরকারী রেজিমেন্টেশন ও নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়ার সূক্ষ্ম প্রয়াস বলে অনেকেই মনে করতেন। তাছাড়া, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে তখন স্বভাবতই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তুষ্টি বিরাজ করছিল। ফররুখ আহমদ প্রতিক্রিয়াশীল আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের সর্বদাই বিরোধিতা করে এসেছেন। তাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত বিএনআর প্রতিষ্ঠানের কোনরূপ সহযোগিতা নিতে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং স্বাধীনচেতা কবি ফররুখ আহমদ স্বভাবতই অনীহা প্রকাশ করেন।
একারণে ডক্টর হাসান জামানের আন্তরিক প্রস্তাবে তিনি কখনও সাড়া দেননি। তবে তাঁর অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে কবি শেষ পর্যন্ত বেনামিতে লেখা মঙ্গল কাব্য ঢংয়ের তাঁর তিনটি ব্যঙ্গ কাব্য উক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রকাশের জন্য দিয়েছিলেন। আমি তখন কবির সান্নিধ্য লাভের আশায় প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যেতাম। কবি সোৎসাহে তাঁর ঐ তিনটি কাব্যের অংশবিশেষ আমাকে পড়ে শুনাতেন। তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপাত্মক লেখার মধ্যে যে তীক্ষèতা রয়েছে তাঁর পড়ার ভঙ্গি, আর চোখ-মুখের ভঙ্গি আর দীপ্তির মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশী তীক্ষèতা আমি অনুভব করেছি। ঘটনাচক্রে আমি সেদিন বিকেলে কবির বৈঠকখানায় উপস্থিত ছিলাম। আমার উপস্থিতিতেই ডক্টর হাসান জামান এলেন কবির বাসায়। তিনি বিদায় হবার আগে কবি পাণ্ডুলিপি তিনটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন। দুর্ভাগ্যবশত এর কিছুদিন পরই বিএনআর বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল কিনা অথবা পাণ্ডুলিপিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল কিনা জানি না। কারণ কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থ তালিকার মধ্যে এ পর্যন্ত ঐ গ্রন্থগুলির কোন নাম আমার চোখে পড়েনি।
যাই হোক, প্রকাশক ও প্রকাশনা-শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি এরূপ নিঃস্পৃহ ও নেতিবাচক মনোভাবের ফলেই কবির জীবনকালে তাঁর অধিকাংশ লেখাই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে পারেনি। ফলে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের তুলনায় অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা অনেক বেশী। এখানে তাঁর গ্রন্থাবলির একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করা হলো। কবির জীবদ্দশায় যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার একটি তালিকা নি¤œরূপ ঃ
১. সাত সাগরের মাঝি। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৪৪। প্রকাশক ঃ বেনজীর আহমদ, নওরোজ পাবলিশিং হাউজ, ১০৬-এ সার্কাস রোড, কলকাতা। মূল্য ঃ দুই টাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ জয়নুল আবেদীন। (দ্বিতীয় সংস্করণ) তমদ্দুন সংস্করণ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫২। রচনাকাল ঃ ১৯৪৩-৪৪। প্রকাশক ও মুদ্রাকর ঃ তৈয়েবুর রহমান, এম.এ, তমদ্দুন প্রেস, ৫০ লালবাগ রোড, ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান। দাম ঃ দু’টাকা আট আনা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কামরুল হাসান। পৃষ্ঠা ঃ ৮৩।
২. আজাদ করো পাকিস্তান (ভিতরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে ঃ আজাদ করো পাকিস্তান। ফৌজের গান ও অন্যান্য কবিতা)। প্রথম সংস্করণ ঃ ১৯৪৬। প্রকাশক ঃ কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ ও এস.এম. বজলুল হক, মৃত্তিকা গ্রন্থনি বিভাগ, ১০-বি তারক দত্ত রোড, বালিগঞ্জ, কলকাতা। মুদ্রাকর ঃ কালিপদ নাগ, ভারতী প্রেস, ৫ সানিআত সেন স্ট্রিট, কলকাতা। মূল্য ঃ রাজ সংস্করণ ঃ এক টাকা, সুলভ সংস্করণঃ আট আনা। ক্রাউন সাইজ, পৃষ্ঠা ঃ ২০।
৩. সিরাজাম মুনীরা। প্রথম সংস্করণ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫২। রচনাকাল ঃ ১৯৪৩-৪৬। প্রকাশক ও মুদ্রাকর ঃ তৈয়েবুর রহমান, এম.এ, তমদ্দুন প্রেস, লালবাগ, রোড, পূর্ব পাকিস্তান। দাম ঃ দু’টাকা আট আনা। ডিমাই সাইজ, পৃষ্ঠা ঃ ৮৮।
৪. নৌফেল ও হাতেম। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৬১। প্রকাশক ঃ পাকিস্তান লেখক সংঘের পক্ষেÑ ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, বর্ধমান হাউস, ঢাকা-২। মূল্য ঃ দু’টাকা পঞ্চাশ ফয়সা। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ নূরুল ইসলাম আলপনা। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৬৫। তৃতীয় সংস্করণ ঃ জানুয়ারি ১৯৬৭। প্রকাশক ঃ মোহাম্মদ নাসির আলী।, নওরোজ কিতাবিস্তান, ৪৬ বাংলাবাজার, ঢাকা-১। চতুর্থ সংস্করণ ঃ আগস্ট ১৯৬৭। প্রকাশক ঃ মহিউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৭ জিন্দাবাহার প্রথম লেন, ঢাকা-১। মূল্য ঃ তিন টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৪+৯২।
৫. মুহূর্তের কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩। প্রকাশক ঃ এফ. আহমদ, বার্ডস অ্যান্ড বুকস্, ৪ ফোল্ডার স্ট্রিট, ঢাকা-৩। মুদ্রক ঃ এম. এ. কাদের, দি ইম্পিরিয়াল প্রেস, ১০ হাটখোলা রোড, ঢাকা-৩। মূল্য ঃ তিন টাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। পৃষ্ঠা ঃ ৮+১০০।
৬. ধোলাই কাব্য। ফররুখ আহমদের ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গ কবিতার সংকলন। সংগ্রহ ও সম্পাদনায় ঃ ফারুক মাহমুদ। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৬৩। পরিবেশনায় ঃ নয়া দুনিয়া পাবলিকেশন্স, ১৪৩ বংশাল রোড, ঢাকা-১। প্রচ্ছদ ঃ মুহম্মদ আলী ও আব্দুস সাদেক। দাম ঃ দু’টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৭২।
৭. হাতেম তা’য়ী। প্রথম প্রকাশ ঃ মে ১৯৬৬। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। মুদ্রক ঃ এ্যাবকো প্রেস, ৬/৭ আওলাদ হোসেন লেন, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ আব্দুর রউফ। মূল্য ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮+৩২৮।
৮. পাখির বাসা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৬৫। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ কাজী আবুল কাসেম।
৯. হরফের ছড়া। প্রথম প্রকাশ ঃ মার্চ ১৯৬৮। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ এ, মুক্তাদির। মুদ্রক ঃ পাইওনিয়ার প্রেস, ঢাকা। দাম ঃ এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা। পৃষ্ঠা ঃ ২৬।
১০. নতুন লেখা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৬৯। প্রকাশক ঃ আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা।
১১. ছড়ার আসর (১)। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৭০।
এছাড়া, ছোটদের উপযোগী কয়েকটি পাঠ্যবই কবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়। এগুলো হলো ঃ
১২. নয়া জামাত (প্রথম ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৫০। তৃতীয় মুদ্রণ ঃ ফেব্র“য়ারি ১৯৫১। প্রকাশক ঃ মুখ্দুমী এ্যান্ড আহসানউল্লাহ লাইব্রেরি, বাবুবাজার, ঢাকা। মুদ্রক ঃ শ্রীনাথ প্রেস, ঢাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কামরুল হাসান। মূল্য ঃ এক টাকা চার আনা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪। ইস্ট বেঙ্গল টেক্সট কমিটি কর্তৃক পঞ্চম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত, ঢাকা গেজেট ১৮-১-৫১।
১৩. নয়া জামাত (দ্বিতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ জানুয়ারি ১৯৫১। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ। মূল্য ঃ এক টাকা ছয় আনা। পৃষ্ঠা ঃ ৭২+২৬। টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
১৪. নয়া জামাত (তৃতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা ঃ ৮৬+৩৭। সপ্তম শ্রেণীর জন্য লিখিত বাংলা সাহিত্য। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ।
১৫. নয়া জামাত (চর্তুথ ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা ঃ ৯৬+৬৪। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ। টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক অষ্টম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
কবির ইন্তিকালের পর তাঁর যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত বা পুনঃমুদ্রিত হয় তা নিম্নরূপ ঃ
১. ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৭৫। সম্পাদকঃ আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ মুহম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফররুখ স্মৃতি তহবিলের পক্ষে। মুদ্রক ঃ বাংলা একাডেমীর মুদ্রণ বিভাগ। প্রচ্ছদ পরিকল্পক ঃ ফজল শাহাবুদ্দীন। মূল্য ঃ পনেরো টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১৬+৮৮।
২. সাত সাগরের মাঝি। তৃতীয় সংস্করণ ঃ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭২ (১৯৭৫)। প্রকাশক ঃ ইফতেখার রসুল জর্জ, নওরোজ কিতাবিন্তান, ৪৬ বাংলাবাজার, ঢাকা। মুদ্রক ঃ এম. আলম, ইডেন প্রেস, ৪১/এ হাটখোলা রোড, ঢাকা। চিত্র ঃ ড. নওয়াজেশ আহমদ। মূল্য ঃ নয় টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১০১। পরিশিষ্টে মুজীবুর রহমান খাঁÑরচিত ‘সাত সাগরের মাঝিÑনারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ সন্নিবেশিত। চতুর্থ সংস্করণ ঃ ১০ জুন ১৯৯০। প্রকাশক ঃ নলেজ হোম, ১৪৬ গভর্নমেন্ট নিউমার্কেট, ঢাকা-১২০৫। মুদ্রক ঃ শিল্পতরু, ২৯০ সোনারগাঁ রোড, ঢাকা-১২০৫। প্রচ্ছদ ঃ শিবনাথ বিশ্বাস। মূল্য ঃ পঁয়ত্রিশ টাকা। পৃ. ৬৪।
৩. হরফের ছড়া। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ১৯৭৬।
৪. হে বন্য স্বপ্নেরা। প্রথম প্রকাশ ঃ নভেম্বর ১৯৭৬। কবি-পরিকল্পিত। সম্পাদক ঃ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। প্রকাশক ঃ মুহম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফররুখ আহমদ কেন্দ্রীয় স্মৃতি সংসদের পক্ষে। মুদ্রক ঃ বাংলা একাডেমী মুদ্রণ শাখা। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৫৩।
৫. মুহূর্তের কবিতা। কবি-কৃত পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ অক্টোবর ১৯৭৮। সম্পাদক ঃ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। প্রকাশক ও মুদ্রক ঃ তাজুল ইসলাম, বর্ণ মিছিল, ৬৫ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ দশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১০১।
৬. ফররুখ রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ অক্টোবর ১৯৭৯। সম্পাদক ঃ মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমীর পক্ষে মহিউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৭ জিন্দাবাহার, প্রথম লেন, ঢাকা। মুদ্রক ঃ মানিকলাল শর্মা, মনোরম মুদ্রায়ণ, ১৪ শ্রীশ দাস লেন, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ পঁয়ত্রিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১২+৩৮৮।
৭. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৮০। প্রকাশক ঃ ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী। ভূমিকা ও পরিশিষ্ট ঃ মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। পৃষ্ঠা ঃ ১৬+৮০+৫। দাম ঃ দশ টাকা।
৮. চিড়িয়াখানা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১০ জুন ১৯৮০। প্রকাশক ঃ ঐ। মুদ্রক ঃ ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স লিঃ, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ সবিহ্-উল-আলম। মূল্য ঃ পনেরো টাকা।
৯. নয়া জামাত। প্রথম প্রকাশ ঃ নভেম্বর ১৯৭৮। সংকলক ঃ মাসুদ আলী। প্রকাশক ঃ আধুনিক প্রকাশনী, ১৩/৩ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১। মুদ্রক ঃ পয়গাম প্রেস, ৯ গোপীকিষণ লেন, ঢাকা-৩। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মূল্য ঃ সুলভ ছয় টাকা, শোভন সাত টাকা, পৃষ্ঠা ঃ ৬৪।
১০. কাফেলা। প্রথম প্রকাশ ঃ আগস্ট ১৯৮০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ১৯৮৭। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা। ভূমিকা : মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। প্রথম সংস্করণের মূল্য ঃ আট টাকা, দ্বিতীয় সংস্করণের মূল্য ঃ বিশ টাকা।
১১. হাবেদা মরুর কাহিনী। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৮১। প্রকাশক ঃ ঐ। মুদ্রক ঃ খেয়ালি প্রেস, ঢাকা। ভূমিকা : ঐ। মূল্য ঃ দশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪।
১২. সিন্দাবাদ। প্রথম প্রকাশ ঃ অক্টোবর ১৯৮৩। প্রকাশক ঃ ঐ। সম্পাদক ঃ আখতার-উল-আলম।
১৩. ফুলের জলসা। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৫। প্রকাশক ঃ বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ঢাকা। ছবি ঃ শওকতুজ্জামান। দাম ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ২৪।
১৪. তসবিরনামা। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৬। প্রকাশক ঃ নয়া দুনিয়া পাবলিকেশন্স, ৪৭ নর্থব্র“ক হল রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মুদ্রক ঃ দিনকাল মুদ্রায়ণ, ঢাকা। মূল্য ঃ বিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৫৬।
১৫. কিস্সা কাহিনী। প্রথম প্রকাশ ঃ এপ্রিল ১৯৮৪। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২। মুদ্রক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২।
১৬. ধোলাই কাব্য। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ১৯৮৬। ফররুখ আহমদ লিখিত ভূমিকা সংযোজিত। ভূমিকায় কবি এটিকে ‘ধোলাই কাব্যের পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত, পরিমার্জিতÑঅতীব পরিষ্কার সংস্করণ’, ‘সহীহ বড় সংস্করণ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
১৭. মহফিল (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৭। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মূল্য ঃ বিশ টাকা।
১৮. ফররুখ আহমদের গল্প। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৯০। সম্পাদক ঃ আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ সৃজন প্রকাশনী লিঃ, ৯৯ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, করিম চেম্বার (৫ম তলা), ঢাকা-১০০০। প্রচ্ছদ ঃ মোমিন উদ্দীন খালেদ। মূল্য ঃ চল্লিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
১৯. নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৯৫। সম্পাদক ঃ ঐ। প্রকাশক ঃ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ১৪ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, ঢাকা-১০০০। প্রচ্ছদ ঃ শিবনাথ বিশ্বাস। মূল্য ঃ পঞ্চাশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
২০. ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৯১।
২১. দিলরুবা। প্রথম প্রকাশ ঃ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৪। প্রকাশক ঃ আমিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের পক্ষে। ভূমিকা : আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ ঃ মোমিন উদ্দীন খালেদ। মূল্য ঃ ষাট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪।
২২. ফররুখ আহমদ রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৯৫। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত। প্রচ্ছদ ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ দুইশত পঞ্চাশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৩২+৬০৫।
২৩. ফররুখ আহমদ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৯৬। প্রকাশক ঃ ঐ। সম্পাদনা ঃ ঐ। প্রচ্ছদ ঃ ঐ। মূল্য ঃ দুইশত টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৩৯+৫০৪।
২৪. সিরাজাম মুনীরা। ফররুখ একাডেমী সংস্করণ (সৈয়দ আলী আহসানের ভূমিকা ও মুহম্মদ মতিউর রহমান রচিত প্রসঙ্গ কথা সংযুক্ত), সেপ্টেম্বর, ২০০০। প্রকাশক ঃ ফররুখ একাডেমী, প্রচ্ছদ ঃ রফিকুল্লাহ গাজ্জালী। মূল্য ঃ ষাট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
এছাড়া, ফররুখ আহমদ রচিত আরো যেসব পাণ্ডুলিপির পরিচয় পাওয়া যায়, তার একটি তালিকা নিম্নরূপ ঃ
১। অনুস্বর (ব্যঙ্গ কবিতা) রচনাকাল ঃ ১৯৪৪-৪৬, ২। বিসর্গ (ব্যঙ্গ কবিতা) রচনাকাল ঃ ১৯৪৬-৪৮, ৩। হাল্কা লেখা, ৪। তস্বিরনামা, ৫। রসরঙ্গ, ৬। রক্ত গোলাব (গানের সংকলন), ৭। কাব্যগীতি, ৮। রাজ-রাজরা (গদ্য ব্যঙ্গ নাটিকা), ৯। ছড়ার আসর (২), ১০। ছড়ার আসর (৩), ১১। সাঁঝ সকালের কিস্সা, ১২। আলোকলতা, ১৩। খুশির ছড়া, ১৪। মজার ছড়া, ১৫। পাখির ছড়া, ১৬। রং মশাল, ১৭। জোড় হরফের ছড়া, ১৮। পড়ার শুরু, ১৯। পোকামাকড়, ২০। কুরআন মঞ্জুষা, ২১। আমপারা (কুরআন শরিফের ২৯টি সূরার অনুবাদ), ২২। সিকান্দার শা’র ঘোড়া (একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস), ‘মৃত্তিকা’ পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ, ১৩৫৩ সংখ্যায় ‘এ কোন দেশ’ ও ‘সীমানা’ Ñ এ শিরোনামে উক্ত উপন্যাসের আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়া, ফররুখ আহমদের কিছু প্রবন্ধ রয়েছে যা আজও পুস্তকাকারে প্রকাশিত বা গ্রন্থিত হয় নি। তাঁর রচিত বইয়ের উপরোক্ত তালিকা যে সম্পূর্ণ তাও নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। ফররুখ আহমদ বিশ্ববিখ্যাত কয়েকজন উর্দু ও ফারসি কবির কবিতাও অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের দার্শনিক কবি ইসলামী পুনর্জাগরণের অন্যতম দিশারি মহাকবি আল্লামা ইকবাল, পাকিস্তানের মরমি কবি শাহ আব্দুল লতিফ ভিটাই, প্রখ্যাত উর্দু কবি আলতাফ হোসেন হালী এবং ইরানের বিশ্ববরেণ্য সুফী কবি হাফিজ ও শেখ সাদী (রহঃ)-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে তিনি আল-কুরআনের কিছু সংখ্যক সূরার অনুবাদ করেছিলেন। কবির এ-সকল অনুবাদ কবিতার সবগুলোই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, অন্যান্য কবির অনূদিত বিভিন্ন কবিতার সংকলনেও স্থান পেয়েছে। তবে সবগুলো কবিতা গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে কিনা তা নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। অনুবাদ কবিতার মধ্যে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। এগুলোর মধ্যেও তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছে।
কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রচনাবলীর উপরোক্ত তালিকা থেকে তাঁর প্রতিভার বিশালত্ব, রচনার বৈচিত্র্য ও বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা সম্পর্কে সহজেই ধারণা করা চলে। ফররুখ আহমদ ছিলেন অত্যন্ত শিল্প-সচেতন। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বিশেষত বিশ্ব-বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের সুবিখ্যাত-কর্মের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি সেসব সাহিত্যের ভাব, শিল্প-কুশলতা, বর্ণনাভঙ্গী ও সাফল্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্প-সুন্দর সাহিত্য-সম্ভার উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তিনি কখনো কাউকে অনুকরণ করেননি। যথার্থ মৌলিক প্রতিভা কখনো কাউকে অনুকরণ করে না। তবে তাঁরা উৎকৃষ্ট উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে থাকেন এবং শিল্প-প্রকরণগত বিভিন্ন ভঙ্গি ও দৃষ্টিকে শৈল্পিক কুশলতায় কাজে লাগিয়ে থাকেন। ফররুখ আহমদ ছিলেন এক যথার্থ সৃষ্টিশীল মৌলিক প্রতিভার অধিকারী কবি। তিনি তাঁর ভাব, ভাষা, ব্যঞ্জনা ও আবেদনের দিক দিয়ে কাব্যের এক মহীয়ান, দীপ্তিমান, স্বতন্ত্র ভুবন নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন। কবি হিসাবে এটা তাঁর অনন্য-উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য।
ফররুখ আহমদের কাব্যের বর্ণনা, বিষয় ও উপজীব্য বহু বিচিত্র। তাঁর কাব্যে একদিকে যেমন বাংলার সবুজ প্রকৃতি, নানা ফসলে পূর্ণ মাঠ, নদী-নালা, ফুলের সুবাস, পাখির কল-কাকলি রয়েছে, তেমনি রয়েছে দিগন্ত-বিস্তারী, ধূসর মরুভূমি, আরব্য জনপদ, ঝড়-গতিসম্পন্ন তাজী ঘোড়া, ‘মরুভুমির জাহাজ’ নামে খ্যাত দ্রুত গতির উট, দিগন্ত-বিস্তারী সবুজ খেজুর বীথি ও সে দেশের বিচিত্র মানুষের জীবন্ত প্রতিকৃতি। এবং আরো রয়েছে দিগন্ত-ছোঁয়া নীল সমুদ্র, উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষোভ, সংগ্রামময় অবিশ্বাস্য জীবনের দুরন্ত আকুতি। তাঁর কল্পনার বিশাল ভুবনে মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, সমুদ্র, আকাশ ও মরুভূমির সীমাহীন বিস্তার। স্বপ্ন-সাধে সম্পন্ন মানুষ সেখানে নিরন্তর সংগ্রাম-মুখর। এ রোমান্টিক স্বপ্নাচ্ছন্নতা ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার সমন্বয়ে ফররুখের কবিতায় এক দুরন্ত আবেগ ও গতিময়তার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা কাব্যে যা নিতান্ত দুর্লভ। বাংলা সাহিত্যে কোন কবির বর্ণনায়ই এরূপ বিশাল, বিস্তৃত ইজেলে সুসংগত বর্ণ-বিন্যাসের অনুপম দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
ফররুখ আহমদ তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণের দুর্লভ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। এক্ষেত্রে অনেকে তাঁকে কাজী নজরুল ইসলামের অনুসারী মনে করেন। মধ্যযুগে যে ভাষায় বাংলা সাহিত্য রচিত হয়েছে, তাতে আরবি, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দরাজির সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। এটাকে অনেকে ‘ফারসি বাংলা’, ‘পুঁথি সাহিত্যের ভাষা’, ‘মুসলমানি জবান’ ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিহিত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, সে যুগে এটাই ছিল বাংলা ভাষার রূপ। এ ভাষা তখন জনগণের কথ্যভাষা হিসাবে যেমন প্রচলিত ছিল, তেমনি লেখ্যভাষা হিসাবেও এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় এ ভাষা ব্যবহার করেন। তবে সঙ্গত কারণেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এর প্রচলন অধিকতর ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম এ তথাকথিত ‘মুসলমানি জবান’ তাঁর কাব্যরচনায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন।
ফররুখ আহমদ এক্ষেত্রে নজরুলের অনুসারী হলেও আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে তিনি আরো অনেক বেশি শিল্পসম্মত ও পরিমার্জিত ছিলেন। তবে এক্ষেত্রে বিশেষভাবে একটি বিষয় সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন এই যে, ফররুখ আহমদ রচিত ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ ও ‘সিরাজাম মুনীরা’ এ তিনটি মাত্র বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার যত অধিক, তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থে তা সেরূপ পরিদৃষ্ট হয় না। বিশেষত তাঁর প্রাথমিক কবি জীবনে রচিত ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’ পরবর্তীকালে রচিত ‘মুহূর্তের কবিতা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার নিতান্ত বিরল। তাঁর রচিত একুশটি শিশুতোষ ছড়া-কাব্য গ্রন্থে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
তাই শুধুমাত্র কবির রচিত দু’তিনটি কাব্যের ভাষা-ব্যবহার নিয়ে যারা আলোচনা করেন, তারা ফররুখ আহমদের সমগ্র রচনাবলি পড়লে নিরতিশয় বিস্ময়বোধ করবেন, সন্দেহ নেই। ফররুখ আহমদের কাব্যভাষা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। সামগ্রিক বিবেচনায় এটা যেকোন সতর্ক পাঠক উপলব্ধি করবেন যে, ফররুখ আহমদ ভাব-বিষয়, পরিবেশ-প্রেক্ষাপট যথাযথরূপে বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত ও সুসংগত ভাষা ব্যবহার করেছেন। আরবভূমি ও ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বভাবতই আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার অপরিহার্য গণ্য হয়েছে কবির নিকট। এ কারণে সঙ্গতভাবেই ভাব ও বিষয়কে যথাযথরূপে বর্ণনা করার জন্য আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার অপরিহার্য বলে গণ্য করেছেন। কিন্তু ফররুখ আহমদ শুধুমাত্র ‘মরুচারী’ ছিলেন না। বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, পরিবেশ, শস্যভরা মাঠ, দিগন্ত বিস্তৃত সুন্দর শ্যামলীম দৃশ্য, নানা জাতের ফসল, ফল-ফুল-পাখি ইত্যাদি বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি নিছক বাংলা শব্দ ব্যবহার করেছেন। সেখানে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার নিতান্ত দুর্লভ। ভাষা ব্যবহারে ফররুখের এ বৈচিত্র্য, উপযোগিতা ও যথার্থতা সম্পর্কে অনেকেই তেমন সচেতন নন। তাই ফররুখের কাব্যালোচনা প্রসঙ্গে তাঁর সামগ্রিকতার দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা থাকা একান্ত অপরিহার্য। তাহলে ফররুখ সম্পর্কে অনেক জিজ্ঞাসা, দ্বিধা-সংশয় ও অপপ্রচারের অবসান ঘটবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
ইসলামী ঐতিহ্য ও ভাবধারা ফররুখ-কাব্যের মূল অনুপ্রেরণা ও কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু ধর্মীয় তত্ত্বকথা তাঁর কাব্যে ফুটে ওঠেনি। চিরন্তন মানবতার সুন্দরতম আদর্শ হিসাবে তিনি প্রতীকী দ্যোতনায় কাব্যময় করে বাস্তব জীবনানুভূতির সাথে অবিমিশ্র করে তুলেছেন ইসলামের মূল আদর্শ ও প্রাণ-সম্পদ। ফররুখ আহমদ প্রকৃত জীবন-শিল্পী। তাই তাঁর আদর্শ-চেতনার সাথে মানবিক আর্তি, প্রেম-ভালবাসা, আনন্দ-বেদনা, দ্বন্দ্ব-বিক্ষোভ ও আর্তির পাশাপাশি ইসলামী চেতনা কেবল স্বাভাবিক ও সহজ-স্বচ্ছন্দ রূপ লাভ করেছে তাই নয়, হতাশাপূর্ণ জীবন-সংগ্রামে ইসলামী আদর্শ অন্ধকার, নিরাকূল, অথৈ সাগরের বুকে ধ্র“বতারার দ্যুতিময় আলোক-রশ্মির বিস্তার ঘটিয়েছে। কবির নিকট ইসলাম কোন প্রথাগত ধর্ম নয়, সমস্যা-সংকুল পৃথিবীতে এটা স্রষ্টা-প্রদত্ত একমাত্র অভ্রান্ত জীবনাদর্শ যা যুগে যুগে মানব জাতিকে মুক্তির অনিবার্য পথপ্রদর্শন করে এসেছে।
এ ছাড়া, হাল্কা রসিকতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপপূর্ণ বুদ্ধিদীপ্ত রচনা এবং শিশুতোষমূলক নানা বিষয়ের বিচিত্র সমাহার লক্ষ্য করা যায় তাঁর কাব্যে। ফররুখের উপলব্ধি ও জীবনদৃষ্টি যদিও স্থির ও সন্দেহাতীতরূপে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভিসারী। কিন্তু তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু ব্যাপক, বর্ণিল ও বৈচিত্র্যে অপরূপ। কবি যদিও কল্পনাচারী ও রোমান্টিক ভাবালুতায় আচ্ছন্ন, তবু তাঁর কাব্য-ভাবনা জীবন-অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার স্পর্শ-বিবর্জিত নয়। তাই দেখা যায়, কবি স্বপ্নচারী, মরুচারী ও সমুদ্রচারী হওয়া সত্ত্বেও বার বার আটপৌঢ়ে দুঃখ-দারিদ্র্যক্লিষ্ট সাদামাটা জীবনের গণ্ডীতে ফিরে এসেছেন, বাংলার পলিমাটির খোলা প্রান্তরে, মেঘমেদুর ছায়াচ্ছন্ন পাখি ডাকা সবুজ প্রকৃতির বুকে স্বচ্ছন্দ বিহার করেছেন, বাংলার নিরন্ন, বুভুক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফররুখ আহমদকে তাই কখনো একঘেয়ে মনে হয় না। বিষয়বস্তুর এ ব্যাপকতা, গভীরতা ও বৈচিত্র্য ফররুখ-কাব্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। উপরোল্লিখিত গ্রন্থ-তালিকা থেকে ফররুখ-প্রতিভার শক্তিমত্তা, তাঁর সৃষ্টির ব্যাপকতা ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা চলে।
বিষয়বস্তুর সাথে কাব্যের আঙ্গিক ও রূপরীতির ক্ষেত্রেও ফররুখ আহমদ বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন। আধুনিক বাংলা কাব্যের বিভিন্ন শাখা যেমন মহাকাব্য, সনেট, গীতি কবিতা, শিশুতোষ কবিতা, ব্যঙ্গ-রসাত্মক কবিতা, গান-গজল, নাট্য-কাব্য, ব্যঙ্গ-নাটক, গীতিনাট্য ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কবির অনুশীলন ও নিপুণ পদচারণা আমাদেরকে যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্ময়পুলকে অভিভূত করে। বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগ থেকেই কাহিনী কাব্যের ধারা চলে আসছে। কিন্তু ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুকরণে বাংলা কাব্যে মহাকাব্যের সৃষ্টি আধুনিককালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে। মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং সার্থক মহাকাব্য। মহাকাব্য রচনার ধারা যখন শেষ হওয়ার পথে তখন ফররুখ আহমদ তাঁর ‘হাতেম তা’য়ী’ রচনা করে বাংলা সাহিত্যে এক অসাধারণ অবদান রাখেন। মধুসূদনের পরে সম্ভবত এটাই সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক মহাকাব্য। ফররুখের পরে এ পর্যন্ত অন্য কেউ মহাকাব্য রচনায় সফলতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হননি। কারণ, বর্তমান যুগ-পরিবেশ মহাকাব্য রচনার উপযোগী নয় বলে ধারণা করা হয়। যদি তাই হয়, তাহলে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহাকাব্যের রচয়িতা হিসাবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সর্বশেষ মহাকাব্য রচয়িতা হিসাবে ফররুখ আহমদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বাংলা সাহিত্যে সনেট রচনার ক্ষেত্রেও মধুসূদন পথিকৃতের ভূমিকা পারন করেন। শুধু পথিকৃতই নয়, বাংলা সাহিত্যে তিনি সার্থকতম সনেটিয়ার হিসাবে পরিচিত। তাঁর পরে অনেকেই সনেট রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে সনেটের দৃঢ়বদ্ধ শিল্পরীতির কারণে এক্ষেত্রে খুব কম সনেট-রচয়িতাই সফল হতে পেরেছেন। তবে সনেট রচয়িতা হিসাবে ফররুখ আহমদের কৃতিত্ব অসামান্য, এ-কথা অনেকেই স্বীকার করেন। ফররুখ আহমদ মূলত রোমান্টিক কবি হওয়া সত্ত্বেও সনেট রচনার ক্ষেত্রে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে সফল। তাঁর রচিত সনেটের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশত। সংখ্যা ও গুণ-মানের দিক থেকে সনেট রচয়িতা হিসাবে বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের পরেই ফররুখ আহমদের কৃতিত্ব বলে আমার ধারণা।
এভাবে মহাকাব্য, গীতিকাব্য, সনেট, নাট্যকাব্য, ব্যঙ্গ-নাট্য, গীতিনাট্য, শিশুতোষ কাব্য, ব্যঙ্গ কবিতা, গান-গজল ইত্যাদি কাব্যের বিভিন্ন শাখায় ফররুখ আহমদ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলন করে গেছেন এবং সে জন্যই তিনি একস্থানে কখনো স্থির হয়ে থাকেন নি। কাব্য-সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের সন্ধানে কবি সর্বদা ব্যাপৃত থেকেছেন। নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলন-প্রবণতা বড় কবির লক্ষণ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফররুখ আহমদও এক মহৎ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। এজন্য অনেকে তাঁকে শিল্পীকবি হিসাবে আখ্যায়িত করেন। বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য কবির মধ্যে শিল্পীকবির সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোণা। শুধু শিল্পীকবি হিসাবে নয়, ভাব-ভাষা ও বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রেও ফররুখ আহমদ এক অনন্যসাধারণ মৌলিক প্রতিভাধর কবি।
মহৎ শিল্পকর্ম যখন দেশ-কালের গন্ডিকে অতিক্রম করে টিকে থাকে, তখন তাকে কালোত্তীর্ণ মহৎ শিল্পকর্ম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মহাকবি বাল্মিকী, হোমার, শেক্সপিয়র, মিল্টন, ওমর খৈয়াম, হাফিজ, ফেরদৌসি প্রমুখ বিশ্বখ্যাত কবিদের কাব্যসৃষ্টি দেশ-কালের পরিসীমা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যে সর্বজনীন অমূল্য সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কবি ফররুখ আহমদের জন্মের শতবর্ষ পরেও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বর্তমানে অপরিহার্য বিবেচিত হয়ে থাকে। তাঁর জনপ্রিয়তা এবং কাব্যের সম্মোহনী শক্তিতে এখনও অগণিত পাঠক মুগ্ধ-বিগলিত। তাই ফররুখ আহমদকে নিঃসন্দেহে একজন অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কালোত্তীর্ণ অমর কবি হিসাবে চিহ্নিত করা চলে। তিনি শুধু সক্রিয় বৈশিষ্ট্যে সুচিহ্নিত, তাই নয়, বাংলা কাব্যের শ্রেষ্ঠ মৌলিক কবিদের মধ্যেও নিঃসন্দেহে তিনি অন্যতম। — মুহম্মদ মতিউর রহমান