কবি ফররুখ আহমদ

কবি ফররুখ আহমদের জন্ম ১০ জুন, ১৯১৮ সালে মাগুরা জেলার মাঝআইল গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট্ট নদী মধুমতি। নদীর ওপারে কামারখালী ঘাট। তার পাশে রেল স্টেশন, বাজার, পাটের গুদাম ও একটি হাই স্কুল। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল কামারখালী। এমনি একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ গ্রামীণ সমৃদ্ধ ও ব্যস্ত এলাকায় ফররুখের জন্ম। কবির জীবনে মধুমতি নদী ও তাঁর জন্ম স্থানের অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে। কবির লেখা একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘মধুমতি’।
কবি যেদিন ভুমিষ্ঠ হন, সেদিন ছিল রমযান মাসের প্রথম দিন। সাহ্রি খাওয়ার পূর্ব মূহূর্তে তিনি ভুমিষ্ট হন। রমযানে জন্ম বলে দাদী কবির নাম রাখেন ‘রমযান’। বাবা পুলিশ অফিসার খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী ছেলের নাম রাখেন সৈয়দ ফররুখ আহমদ। কবি পরে নিজের নাম থেকে ‘সৈয়দ’ শব্দটি বাদ দেন। মাতা রওশন আখতার। বাবা-মায়ের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ফররুখ আহমদ পিতা-মাতার দ্বিতীয় পুত্র।
বড় ভাই সৈয়দ সিদ্দীক আহমদ। বড় বোন সৈয়দা শরফুর আরা মোকাদ্দেসা খাতুন। ছোট ভাই সৈয়দ মুনীর আহমদ। কবির ছয় বছর বয়সকালে তাঁর মা রওশন আখতার ইন্তিকাল করেন। এরপর দাদির ¯েœহ-যতেœ তিনি লালিত-পালিত হন। দাদি ছিলেন শিক্ষিতা, বিদূষী জমিদার কন্যা। শৈশবে দাদি তার নাতিকে আরবি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্য গ্রামের একজন শিক্ষিতা মহিলাকে নিযুক্ত করেন। তাঁর কাছে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন। আরবি শিখে তিনি কুরআন অধ্যয়ন ও ফারসি শিখে ফারসি ভাষার বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ বিশেষত গুলি¯ঁÍা-বস্তা ইত্যাদি গ্রন্থ অল্প বয়সেই পড়তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার পর কবিকে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করা হয়।
১৯২৭ সালে গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হলে পিতা তাঁকে কলকাতার তালতলা মডেল এম.ই. স্কুলে ভর্তি করে দেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শৈশবে কিছুদিন এ স্কুলে পড়াশুনা করেন। স্কুলের গ্যালারিতে বসেই কিশোর কবি একদিন মনের আনন্দে লিখে ফেলেন-‘কাল যাব খুলনায়/তাতে কোন ভুল নাই’। তালতলা মডেল এম.ই. স্কুলে কবি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর কবিকে ভর্তি করা হয় দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত ‘বালিগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে’। এ স্কুলে তখন শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা। এ স্কুলে কবির সহপাঠী ছিলেন- প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী। কবি তখন থাকতেন কলকাতা পার্ক সার্কাসে ৩৮ দিলকুশা স্ট্রিটে। এখানে দোতলা বাড়ির উপরতলায় থাকতেন ফররুখ পরিবার আর নিচতলায় থাকতেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী আবু রুশদ পরিবার। উভয়ের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। সত্যজিৎ রায় ‘যখন ছোট ছিলাম’ (১৩৮৯) গ্রন্থে তাঁর সহপাঠি ফররুখের প্রসঙ্গটি এভাবে উল্লেখ করেন ঃ
“আমাদের ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে অনিলের কথাটা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ তার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব ছিল। অনিল খুব অল্প বয়সে বেশ কিছুদিন সুইজারল্যান্ডে ছিল একটা কঠিন রোগ সারানোর জন্য। সেরে উঠে দেশে ফিরে ১৯৩৩-এ ভর্তি হয় আমাদের ক্লাসে। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। সঞ্জয়ের যেমন ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, অনিলের পূর্বপুরুষের মধ্যে একজন বিখ্যাত বাঙালি ছিলেন। একবার বি.টি’র (বি.এড কলেজের প্রশিক্ষণার্থী) এক ছাত্র আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন, রোমান ইতিহাস পড়াতে গিয়ে এটুরিয়ার রাজা লার্স পোরসিনার নাম উল্লেখ করা মাত্র মিচ্কে ফররুখ বলে উঠেছে, ‘কী বললেন স্যার, লর্ড সিনহা?’ পিছনেই বসেছিল অনিল। সে ফররুখের মাথায় মারল এক থাপ্পড়। কারণ আর কিছুই না, এই লর্ড সত্যেন্দ্রপ্রসাদ সিংহ ছিলেন অনিলেরই দাদামশাই।” (দ্রষ্টব্য ঃ মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্ ঃ চির সংগ্রামী কবি ফররুখ, পৃ. ২৮)
১৯৩৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার কিছুদিন আগে ফররুখ আহমদ জলবসন্তে আক্রান্ত হন। ফলে যথাসময়ে তাঁর প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। এরপর সুস্থ হলে বাবা তাঁকে আবার ভর্তি করে দেন খুলনা জেলা স্কুলে। এ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেম। স্কুলের ম্যাগাজিনের দায়িত্ব ছিল কবি আবুল হাশেমের উপর। ম্যাগাজিনের জন্য লেখা চাওয়া হলে কবি তাঁর লেখা একটি কবিতা প্রকাশের জন্য তাঁকে দেন। কবির লেখাটি ছিল একটি ছড়া। ছড়াটি এরূপঃ
বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে
রিমঝিমিয়ে রিমঝিমিয়ে,
টিনের চালে গাছের ডালে
বিষ্টি ঝরে হাওয়ার তালে।

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
বিষ্টি নামে মিষ্টি মধুর।
জুঁই চামেলী ফুলের বোঁটায়
বিষ্টি নামে ফোঁটায় ফোঁটায়,
বাদলা দিনের একটানা সুর
বিষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর।

এ সম্পর্কে ফররুখের শিক্ষক কবি আবুল হাশেম লেখেন ঃ “১৯৩৬ সালে বদলি হলাম খুলনা জেলা স্কুলে। সেখানে অজানা মুখের মধ্যে দেখতে পেলাম একমাত্র চেনা মুখ বন্ধু আবুল ফজলের। …খুলনা জেলা স্কুলের ম্যাগাজিনখানার ভার তাঁর উপরেই ন্যস্ত ছিল। আমি সে স্কুলে যোগ দিতেই সে ভারটা তিনি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এম. এ. পরীক্ষা দেবার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন।
ভারটা নিয়ে দেখি কাজটা তত সোজা নয়। …ভারি ঝামেলায় পড়েছিলাম। এর মধ্যে একটা ছেলে এসে একটা লেখা হাতে দিল। ছেলেটাকে দেখতাম ক্লাসের অন্য ছেলেরা যখন মাস্টার সাহেবদের জব্দ করবার জন্য ফন্দি আঁটতে থাকতো, তখন সে বসে থাকতো নির্বাক মুখে, বই মেলে তার ডাগর চোখ দু’টি ঢেকে। লেখাটা পড়ে দেখলাম। চমৎকার লাগল। একটু ঘষামাজা করে সেটা প্রেসে পাঠিয়ে দিলাম।
এই ছেলেটিই হ’ল র্ফরুখ আহ্মদ। সে সেই বছরেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে খুলনা ছেড়ে চলে গেল। এর বন্ধুরা বলতো, কলকাতার বড় পরিবেশে গিয়ে সে নাকি কবিতার তীর ছুঁড়বার স্থান পেয়েছিল। এর বেশী আর কোন খবর তার সম্বন্ধে রাখতে পারি নি।
তারপর দশ বছর কেটে গেল। অসহ্য পেটের বেদনায় অস্থির হয়ে নাড়ি কাটাবার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম কলকাতায়। আশ্রয় নিয়েছিলাম ধর্মতলাতে আমার স্ত্রীর অগ্রজের বাসায়। সেখানে গিয়ে দেখি প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁও কয়েকদিন হ’ল অতিথি হয়ে আছেন অনুরূপ আত্মীয়তা সূত্রে। …একদিন প্রিন্সিপাল সাহেব বাইরে থেকে ঘর্মাক্ত কলেবরে ঘরে এসে দু’খানা বই টেবিলের উপর রাখলেন। সেই বই দু’খানির একখানি ছিল ‘সাত সাগরের মাঝি’। প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, ‘কবি র্ফরুখ আহ্মদ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন’। খবরটা শুনে খুশী হলাম।” (দ্রষ্টব্য ঃ আবুল হাশেম ঃ আমার ছাত্র ফররুখ, মুহম্মদ মতিউর রহমান সম্পাদিত ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২১)।
১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কবি কলকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হন। রিপন কলেজে কবির সহপাঠী হলেন কথাশিল্পী আবু রুশদ। কবির আর এক বন্ধু আবুল হাশেম তখন কলাকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হয়। সে ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা বের করতো। ফররুখ আহমদ অভিযানে নিয়মিত লিখতেন। এরপর হাবীবুল্লাহ্ বাহার চৌধুরী সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় কবির ‘রাত্রি’ নামে একটি সনেট প্রকাশিত হয়। তরুণ বয়সে লেখা সনেটটি সকলের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। সনেটটি এখানে উদ্ধৃত হলো ঃ
ওরে পাখি, জেগে ওঠ, জেগে ওঠ রাত্রি এল বুঝি
ঘুমাবার কাল এল জাগিবার সময় যে যায়-
ওরে জাগ্ জাগ্ তবু অকারণে, রাত্রির ভেলায়-
কোন অন্ধ তিমিরের স্রােতে আসা নিরুদ্দেশে যুঝি’
হে বিহঙ্গ, দিক ভ্রষ্ট নাহি হোয়ো যেন পথ খুঁজি’
অবেলায়। এখোন সম্মুখে আছে ঝড়, আছে ভয়
এখনো আনন্দ আছে-খুঁজিবার দুরন্ত বিস্ময়
তবু অন্ধকার এলে, দেখিলাম রিক্ত মোর পুঁজি।
এখনো যায়নি অস্ত সূর্য মোর ব্যথা আকুলিয়া-
এখনো রয়েছে তার শেষ রশ্মি পাতায় পাতায়
তবু অন্ধকার এল, এল মোর আনন্দ ভুলিয়া
অনন্ত বেদনা সম রিক্ততার তিমির শ্যামলিমা
এ আমার স্বপ্ন নহে, এই কালো মেঘ মৃত্যুসীমা।
১৯৩৭ সালে ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ফররুখ আহমদের আরো চারটি কবিতা- অপ্রয়োজন, মৃত্যুরূপা, নগরপথ ও অন্যায় ছাপা হয়। ঐ বছর সেপ্টেম্বরে ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ফররুখের প্রথম লেখা ছোটগল্প ‘মৃত বসুধা’ ছাপা হয়। কবির প্রথম জীবনে সাহিত্য সাধনায় সহযাত্রী ছিলেন কবি আহসান হাবীব, কথাশিল্পী আবু রুশ্দ, কবি আবুল হোসেন, কবি সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ। ফররুখের ‘পাপ-জন্ম’ কবিতাটি প্রকাশিত হয় ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় (আষাঢ়, ১৩৪৪)।
১৯৩৭ সালে বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবির গুচ্ছ-কবিতা। এরপর ফররুখের কবিতা প্রকাশিত হয় তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘অরণি’, হুমায়ুন কবির সম্পাদিত ‘চতুরঙ্গ’ ও আফসার উদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘মৃত্তিকা’ পত্রিকায়। মৃত্তিকা পত্রিকায় প্রকাশিত ফররুখ আহমদের একটি সনেট-
শূন্য মাঠ-মরা ঘাস
শূন্য মাঠ, মরা ঘাস, বিবর্ণ পাপড়ি গন্ধহীন,
বিক্ষুদ্ধ প্রান্তর পথে দল বেঁধে মৃত্যুর চাতালে
কারা যেন ছুটে যায় অন্ধকারে অথবা পাতালে,
মনের আগ্নেয়গিরি সে মাটিতে তুলেছে সঙ্গিন।
বিবর্ণ মানসে ধরি যত ব্যর্থ রাত্রি আর দিন,
বিস্বাদ কামনা তার অতৃপ্তির ছায়া সহচর
ছুটে চলে পিছে ফেলি পৃথিবীর প্রত্যন্ত ধূসর
আগ্নেয়গিরির সন্ধ্যা তার শান্তি করেছে বিলীন।
গলানো তামায়, তাই পিছনের আবছায়া পথ
যত হাসি, যত গান, যত ফুল সবুজ শাখার
সভয়ে সম্মুখে দেখে শুধু এক বহিৃর পর্বত,
অবিরাম জ্বলিতেছে, ধূমাচ্ছন্ন শিখরে তাহার
বীভৎস ক্ষুধার ছায়া, ম্লান সন্ধ্যা, স্বপ্নের জগৎ
অন্ধ দিবসের তীরে শ্রান্তিভরা ওঠে হাহাকার।।

১৩৪৪-৪৬ সময়কালে ফররুখ আহমদের ‘বিবর্ণ’, ‘মৃত বসুধা’, ‘যে পুতুল ডলির মা’, ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ প্রভৃতি গল্প ছাপা হয়। কবি-খ্যাতি অর্জনের পূর্বে ফররুখ আহমদ গল্প-রচয়িতা হিসাবে সুনাম অর্জন করেন। তবে মাত্র পাঁচটি গল্প লেখার পর তিনি আর কোন গল্প লেখেননি। অবশ্য পরবর্তীকালে তিনি ‘সিকান্দার শাহর ঘোড়া’ নামে একটি উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছিলেন, তবে শেষ করতে পারেননি।
প্রথম জীবনে কবি ‘এফ. আহমদ’ নামে লিখতেন। ১৯৩৮ সালে এ নামে তাঁর কিছু লেখা প্রকাশিত হয় মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায়। ১৯৩৮ সালে প্রখ্যাত কবি দার্শনিক আল্লামা ইকবাল-এর ইন্তেকালের পর ইকবালকে নিবেদিত কবিতা ‘স্মরণী’ লেখেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক ‘সওগাতে’ প্রথম কবিতা ‘আধাঁরের স্বপ্ন’ ছাপা হয় (পৌষ, ১৩৪৪)। ১৯৪৭ (বাংলা ১৩৫৪) পর্যন্ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত সওগাত ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় কবি নিয়মিত লিখেছেন। তখন উদীয়মান তরুণ কবি হিসাবে তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯৩৯ সালে আই.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা, দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী ছিলেন তাঁর সহপাঠী। এসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫) শুরু হয়। যুদ্ধকালে (১৯৪৩) মন্বন্তর দেখা দেয়। মন্বন্তরে অনাহারে লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুবরণ করে। শিল্পী জয়নুল আবেদীন দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। ফররুখ আহমদ দুর্ভিক্ষ নিয়ে ‘লাশ’ ও অন্যান্য কালজয়ী কবিতা লেখেন।
১৯৪০ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে ইংরাজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি হন। এখানে ফররুখ আহমদের শিক্ষক ছিলেন ত্রিশোত্তর যুগের প্রখ্যাত কবি ও লেখক বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। এ সময় কবি কবিতার পাশাপাশি সনেট রচনায় অধিক মনোযোগী ছিলেন। ফররুখের শিক্ষক প্রখ্যাত লেখক প্রমথনাথ বিশী। একদিন ক্লাশে পড়ানোর সময় তাঁর নজর পড়ে ফররুখের নোট বইয়ের দিকে। খাতাটি হাতে নিয়ে একের পর এক পাতা উল্টাতে থাকেন। সেখানে অনেকগুলো সনেট ছিল। বিশী এর কয়েকটি পড়ে বিস্মিত ও পুলকিত হন। খাতাটি হাতে নিয়ে তিনি শিক্ষক কমনরুমে এসে শিক্ষকদের সকলের সামনে ফররুখের সনেট পাঠ করে শুনান। এরপর আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আজ আমি একজন তরুণ শেক্সপীয়রকে আবিষ্কার করেছি।”
এসময় ফররুখের লেখা ‘কাব্যে কোরআন’ শিরোনামে ‘মোহাম্মদী’ ও ‘সওগাতে’ বেশ কিছু সূরা-র স্বচ্ছন্দ অনুবাদ প্রকাশিত হয়। উক্ত একই সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনে গৃহীত ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ (পাকিস্তান প্রস্তাব নামে বিশেষভাবে খ্যাত)-এর প্রেক্ষিতে কবির মতাদর্শগত পরিবর্তন ঘটে। কবির এ মতাদর্শগত পরিবর্তনের জন্য তাঁর মুরশিদ বিশিষ্ট আলেম অধ্যাপক আব্দুল খালেকের বিশেষ অবদান রয়েছে। কবি তাঁর দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। তাঁর অনুপ্রেরণায়ই তিনি ক্রমান্বয়ে বাম মতাদর্শ থেকে ইসলামী চিন্তা-চেতনায় পুরাপুরি উদ্বুদ্ধ হন। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ- ‘সাত সাগরের মাঝি’ স্বীয় মুরশিদ অধ্যাপক আব্দুল খালেককে উৎসর্গ করেন।
১৯৪২ সালে কবির নানার একান্ত আগ্রহে খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুনের (লিলি) সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়েতে কবির পূর্ণ সম্মতি ছিল। বিয়ে উপলক্ষে কবি ‘উপহার’ শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি প্রকাশিত হয় ‘সওগাত’ (অগ্রহায়ণ, ১৩৪৯) পত্রিকায়। খালাতো বোন লিলি ছিলেন সুন্দরী, গৃহকর্মে সুনিপুণা, শিক্ষিতা, শান্ত, ধৈর্যশীলা ও সুশীলা রমণী। কবির কাব্য-সাধনায় তিনি আজীবন সহযোগিতা প্রদান করেছেন। সওগাতে প্রকাশিত কবির ‘উপহার’ কবিতাটি নিচে উদ্ধৃত হলো-
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর ঘর,
রবে চিরদিন এ স্বয়ম্বরে সত্যের স্বাক্ষর,
রবে চিরদিন বিবাহ লগ্ন
রইব প্রেমের মধুতে মগ্ন
হাতে হাত রেখে চলব আমরা অন্তরে অন্তরে;
আমরা দু’জনে ধরার ধূলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥

যেথা তুমি আছো যেথা আমি আছি, যেখানে এ পরিচয়
সেখানে রবে না কোনদিন আর কোন ভয়, সংশয়।
আমরা প্রেমের কপোত-কপোতী
আলোক-পিয়াসী, উর্ধেব জ্যোতি
রবে চিরদিন আমাদের চোখে মধুময় ভাস্বর,
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥

মিলবে প্রভাত, সন্ধ্যা, রজনী বিবাহের উৎসবে,
আমাদের ঘরে নিত্য প্রেমের মিলনোৎসব হবে।
পাড়ি দিয়ে যাবো সাগরে তরণী,
আমাদের মোহে জাগবে ধরণী
অশ্রু শোণিতে ভাসানো ধরার আশ্রয় বন্দর;
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥
নিবিড় বাঁধনে চিরদিন মোরা বাঁধা রবো পাশাপাশি,
দুর্যোগ রাতে, আঘাতে ব্যথাতে ফোটাবো প্রেমের হাসি,
ফোটাবো ঊর্ধ্বে কণ্টকহীন
রাঙা শতদল নিত্য নবীন,
সামনে দাঁড়ালে প্রলয়-ভাঙন পাব না আমরা ডর;
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥

শত ভাঙনের মুখে গড়ে যাব মোরা শত বালুচর,
মুখোমুখী হয়ে কথা কবো রাতে তারা-ঘেরা অম্বর
অজানা যে পথ রয়েছে বিথারি’
নির্ভয়ে দেব সেই পথে পাড়ি
পথ-প্রান্তরে ফোটা ফুল তুলে ছড়াব ধরণী ’পর;
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥

যেথা তুমি আছো, যেথা আমি আছি, যেথা আছে ভালোবাসা-
যেখানে নিত্য প্রেমের শিখায় জাগে জীবন্ত আশা,
সেথা এসে মোরা দাঁড়াব দু’জনে
হাতে হাত রেখে মন রেখে মনে
জাগাবো সেখানে প্রাণ-উৎসব বিচিত্র সুন্দর
আমরা দু’জনে ধরার ধুলায় বাঁধব বাসর-ঘর॥

১৯৪৩ সালে কলকাতা আই.জি. প্রিজন অফিসে চাকরিতে যোগদান করেন। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে’র সপ্তম অধিবেশনে কবি আবৃত্তি করেন, ‘দল-বাঁধা বুলবুলি’ ও ‘বিদায়’ শীর্ষক কবিতা। ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’, ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘সিরাজাম মুনীরা’, ‘কাফেলা’ প্রভৃতি কাব্যের অন্তর্গত বেশ কিছু কবিতাও তিনি এ সময় রচনা করেন। এসময় রচিত ১৩৫০-এর মন্বন্তর বিষয়ক কবিতাগুচ্ছ তাঁর অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে আছে।
১৯৪৪ সালে অগ্রজ কবি বেনজির আহমদের অর্থানুকূল্যে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘আকাল’-এ সংকলিত ফররুখের ‘লাশ’ শীর্ষক কবিতা ছাপা হয়। কবির পিতা সৈয়দ হাতেম আলী ইন্তেকাল করেন ১০ নভেম্বর ১৯৪৪। ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ সম্মেলনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ পেশ করেন। এরপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার হয়। ফররুখ আহমদ এরপর থেকে অসংখ্য কবিতা ও গান লিখে অধঃপতিত মুসলিম জাতির নবজাগরণ ও স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সকলকে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) ও ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ (১৯৪৬) এ পটভূমিতেই লেখা। এসময় রচিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় মুসলিম নবজাগরণের প্রেরণা সঞ্চারিত হয়। এসব কবিতা কবি স্বকণ্ঠে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে আবৃত্তি করতেন। এসময় তাঁর লেখা অনেক গান সাধারণ মানুষকে উদ্ধুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করতে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের বিভিন্ন সভায় গাওয়া হতো। জনমনে তা যাদুর মত কাজ করতো। এখানে পাকিস্তান আন্দোলন সফল করার উদ্দেশ্যে রচিত একটি কবিতার কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত হলো-
নিশান আমার! একদিন তুমি হে দূত উষার
খালেদের হাতে, তারেকের হাতে, হ’য়েছে সওয়ার,
উমর, আলির হাতের নিশান নবীজির দান।
আমাদের কাছে নিশান তোমার শিখা হ’ল ম্লান।
তুমি আনো ফের হেজাজ মাঠের মরু সাইমুম
ভাঙো আঁধারের শিখর ওড়াও জড়তার ঘুম,
তুমি আনো সাথে মানবতার সেই নির্ভীক ঝড়
প্রলয়াকাশের বুকে জীবনের দাও স্বাক্ষর,
আউষ ধানের দেশে মদিনার সৌরভ ভার
ঝড় বৈশাখে জাগো নির্ভীক, জাগো নিঃশঙ্ক হেলাল আবার
হও প্রতিষ্ঠ আকাশে আকাশে নিশান আমার
নিশান আমার॥
(নিশান ঃ সাত সাগরের মাঝি)

এসময় বাঙালি মুসলিমের একমাত্র দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায় ‘মুকুলের মাহফিল’ নামে ছোটদের পাতা বের হতো। পরিচালক ছিলেন ‘বাগবান’ বা কথাসাহিত্যিক মোদাব্বের। তাঁর অনুরোধে কবি ছোটদের জন্য মুকুলের মাহফিলে অনেক ছড়া-কবিতা লেখেন। তখন বাঙালি মুসলিম শিশু-কিশোরদের প্রতিষ্ঠান ‘মুকুলের ফৌজ’ পরিচালনা করেন শিল্পী কামরুল ইসলাম। বন্ধু কামরুল ইসলামের অনুরোধে কবি শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক গান লিখেছেন। এখানে দু’টি গান উদ্ধৃত হলো-
সাম্নে চল্, সামনে চল্
তৌহিদেরি সান্ত্রী দল
সাম্নে চল্, সামনে চল্॥
আসুক ডর, আসুক ভয়
আসুক হিম দুঃসময়-
আসুক দুঃখ পাষাণ বুক
মৃত্যু বাধা ঃ ঝড় বাদল
সাম্নে চল্, সামনে চল্॥
লক্ষ ভয় করবো জয়
তুলবো ঝড় বিশ্বময়
গড়বো আজ খোদার রাজ
ভাঙবো বাঁধা অমঙ্গল
সাম্নে চল্, সামনে চল্॥
শুনবো না আর পিছন টান
মানবো-না আর বান তুফান
ডাকছে খুন রক্তারুপ
পাকিস্তানের পথ উজল
সাম্নে চল্, সামনে চল্॥
(ফৌজের গান ঃ আজাদ করো পাকিস্তান)

ওড়াও ঝান্ডা খুনেরা লাল
ওড়াও আকাশে আল্-হেলাল
খঞ্জরে দুনিয়া জিঞ্জির ভীতি
কাঁপুক দুনিয়া টালমাটাল।।
আনো সাম্যের নতুন গান
আনো মানুষের নতুন প্রাণ
আনো উদ্দাম ঝঞ্ঝার গতি
দরিয়ার ঝড়ে ফেনোচ্ছল।।
জালিমের হাতে পশুর-প্রায়
আজো মজলুম মরিছে হায়
ছিঁড়িতে তাদের মরণের ঘের
হও মুজাহিদ আজি সামাল।।
(ওড়াও ঝান্ডা: আজাদ করো পাকিস্তান)

১৯৪৫ সালে পি.ই.এন. আয়োজিত রাইটার্স কনফারেন্স-এ বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নেতা অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ এক সেমিনারে আলোচনা প্রসঙ্গে কবি হিসাবে ফররুখ আহমদের সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সেমিনারে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। কবি আব্দুল কাদির ও রেজাউল করীম-সম্পাদিত কাব্য-মালঞ্চে ফররুখ আহমদের ‘শিকার’, ‘হে নিশানবাহী’ ও ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতাত্রয় সংকলিত হয়। সংকলনের ভূমিকায় বিশেষ গুরুত্বসহকারে ফররুখ আহমদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। এসময় কবি ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগে যোগ দেন। ঐসময় একদিন কবি তাঁর লেখা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ শীর্ষক একটি গান পত্রিকার টেবিলে রেখে এলে পরের দিন সবিস্ময়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে লেখাটি পত্রিকার মালিক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নামে ছাপা হয়েছে। এতে কবি রুষ্ট হন এবং প্রতিবাদে তিনি ‘মোহাম্মদীর’ চাকরিতে ইস্তফা দেন। এ অপকর্মের বিচার চেয়ে তিনি আদালতে মামলাও করেছিলেন। কিন্তু তদবিরের অভাবে মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। অবশেষে কবি এর প্রতিবাদে ব্যঙ্গ কবিতা লিখে অন্তরের জ্বালা মিটাবার প্রয়াস পান। নিচে উদ্ধৃত ‘তসবির নামা’ শীর্ষক ব্যঙ্গ কবিতাটি হায়াত দারাজ খাঁ পাকিস্তানী ছদ্মনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। কবিতাটি এরূপঃ
তোমরা কেউ ব’লো না ভাই হায়াত দারাজ খাঁ-কে
অকারণে মারতে টোকা সব মানুষের টাকে।
হায়াত দারাজ মারে তাকে স্বভাবটা যার মন্দ
মিলে মিশে না থাকে যে বাড়ায় কেবল দ্বন্দ্ব।
একটা কথা বলতে গিয়ে তিনটে বলে মিথ্যে
পরের খাতা টুকলি মেরে জাহির করে বিদ্যে।
কাজের বেলায় কুঁড়েমি আর কাজ করে যে অল্প
বাহাদুরীর খোঁজে তবু বাড়িয়ে বলে গল্প।

ফররুখ ‘কবিতা চোরের প্রতি’ শীর্ষক আরেকটি ব্যঙ্গ কবিতা নি¤œরূপঃ
বোমা মারিলেও কাব্যকণা হয় না বাহির
কবিতা চুরিতে তাই মনোযোগী বৃদ্ধ জ্ঞান পাপী,
অসৎ উপায়ে চাও নাম কিছু করিতে জাহির
সতর্ক দেশের লোক ধরে ফেলে অচিরে তথাপি।
১৯৪৬ সালে ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ কাব্য প্রকাশিত। সর্বভারতীয় দাঙ্গার প্রেক্ষিতে তিনি এসময় দাঙ্গা-বিরোধী কয়েকটি কবিতা লেখেন। এসময়ে তিনি কলকাতা বেতারে, ‘নিজের রক্ত’ শীর্ষক দাঙ্গা-বিরোধী কবিতা আবৃত্তি করেন। আকাশবাণীর গল্পদাদুর আসরেও কবি অংশগ্রহণ করেন। এ সময় জলপাইগুড়িতে একটি প্রাইভেট ফার্মে কবি চাকরি নেন। কিন্তু দেশ জুড়ে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও স্বাধীনতা আন্দোলন প্রচন্ড রূপ লাভ করায় অশান্তি বিরাজ করছিল। এ অবস্থা কবি সহ্য করতে না পারায় অল্প কয়েক দিন পর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
দেশ বিভাগের পর উদ্দেশে ১৯৪৬ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এসময় দেশ বিভাগ ও পাকিস্তানের বিরোধিতা করে ভারতব্যাপী উগ্রপন্থী হিন্দু ও শিখ সম্মিলিতভাবে মুসলিম নিধন যজ্ঞে অংশগ্রহণ করে। ভারতবাসীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতের মাটি। এ ভ্রাতৃঘাতি পাশবিক আচরণে ফররুখ আহমদ অতিশয় ক্ষুব্ধ হন। এসময় তিনি দাঙ্গা-বিরোধী কবিতা লিখে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিরোধিতা করেন। কলকাতা আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর এসব কবিতা প্রচার করা হয়। এ ধরনের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
নিজের রক্ত
এবার দেখেছি নিজের রক্ত, দেখেছি আর
রক্ত নেবার পাশবিক মত্ততা,
এবার শুনেছি, কোটি ফরিয়াদ, শুনেছি আর
শত মুমূর্ষু কণ্ঠে আকুলতা।…
শুনেছি অযুত মানুষের আহাজারি
শুনেছি দু’পাশে অসহায় হাহাকার
নিজের রক্তে ভাসায়েছি এ পৃথিবী
মৃত্যুর মুখে পথ নাই বাঁচবার।
নিজের কণ্ঠ খুঁজেছি প্রেতের মত
করেছি অন্ধ নিজের ঘরেই চুরি,
বুঝি নাই কার আদেশে ভাগ্যাহত
নিজের বুকেই নিজে চালিয়েছি ছুরি

ফররুখ আহমদ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় (২৩ নভেম্বর ১৯৪৬) ‘বন্ধু’ শিরোনামে কবিতা লেখেন। কবিতাটি এরূপ-
আজকে পারি না তাকাতে তোমার পানে,
দশ শতকের পরিচয় আজ লজ্জায় নত মুখ
বন্ধুকে আমি হেনেছি আঘাত অপমৃত্যুর বানে,
কলঙ্ক-ম্লান গভীর ব্যথায় আজ ভরে ওঠে বুক।
বন্ধু আমার ক্ষমা করো অপরাধ
এসো এক সাথে মুছে ফেলি এই ভুল
তোমার স্বপ্নে জাগুক আবার আমার স্বপ্নসাধ,
চলো এক সাথে দুইজনে মিলে তুলি এ পাপের মূল।
১৯৪৭ সালে এসময় বেকার যুবক ফররুখ আহমদ দারুণ অর্থকষ্টে জীবন-যাপন করেন। শ্বশুরালয় দূর্গাপুর, যশোর থেকে ৫-১-১৯৪৭ তারিখে বন্ধু আব্দুল হককে লেখা তাঁর এক চিঠিতে বেকার ও বিবাহিত যুবক ফররুখের নিদারুণ অর্থকষ্টের কথা অকপটে ব্যক্ত করেছেন। অনেকটা ব্যঙ্গাত্বক ভাষায় লেখা তাঁর এ চিঠিটি নিচে উদ্ধৃত হলোঃ
“বহুদিন পর আপনার উৎসাহব্যঞ্জক চিঠি পেয়ে উল্লসিত হয়েছি। কারণ আমার অবস্থা বর্তমানে সেই রূপকথার শেয়ালের মতো, যাকে প্রহরান্তে আধমরা অবস্থায় গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অবশ্য শেয়ালের সঙ্গে আমার পার্থক্য এইটুকু যে, শেয়ালের অন্ন চিন্তা ও বস্ত্র সমস্যা ছিল না। আমার ওদু’টো তো আছেই তার ওপর আছে পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের চিন্তা।
…দু’ চারটি সামান্য সিরিয়াস কবিতা লিখেছি। কাগজের অভাবে এতদিন প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এইবার প্রকাশ করার সুযোগ এসেছে। ট্যাকের (আর্থিক) অসচ্ছলতার দরুন আমাকে বাধ্য হয়ে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে পত্রালাপ অথবা সংশ্রব বর্জন করতে হয়েছিল। (কারণ পোস্ট কার্ড কেনার মত পয়সা হামেশাই প্রচুর সংখ্যায় থাকতো না।) ঐ একই কারণে আপনাকে একখানা অর্ধ ব্যবহৃত কাগজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে চিঠি লিখছি, কারণ পরিষ্কার কাগজ আমার তহবিলে নাই।
যাই হোক, কলকাতা যাওয়ার পাথেয় জোগাড় করেছি, কয়েকদিন আহারের বন্দোবস্ত করতে পারলেই আমি অনতিবিলম্বে কলকাতা অভিমুখে পদচালনা করব। হয়তো এই চিঠি পাওয়ার কয়েকদিন পরেই আপনার এই মহাকবির মুখচন্দ্র (দাঁড়ি আবৃত) দর্শন করে কৃতার্থ হবেন। এই উপলক্ষে প্রাথমিক আয়োজন শেষ করে ফেলেছি। নগদ আট আনা খরচ করে জুতো সেলাই এবং কয়েকটি পট্টি সংযোগ করা হয়েছে। এমন কি একটা নতুন কামিজের জোগাড়ও হয়ে যেতে পারে। পুরানো শীতবস্ত্রগুলো বর্তমানে খুব কাজে লাগছে।”
প্রীতিমুগ্ধ
ফররুখ আহমদ

এ বছরে কবি আব্দুল কাদির-রচিত ‘নবীন কবি ফররুখ আহমদ’ নিবন্ধটি কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত হয়। ‘পাকিস্তান ঃ রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় (সওগাত, আশ্বিন, ১৩৫৪)। এ বছর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘তমদ্দুন মজলিশে’র জন্ম হয়। এ সময় কবি ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত প্রবন্ধ, কবিতা, সনেট, ব্যঙ্গ কবিতা ইত্যাদি রচনা করেন। এসময় বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশ্যে রচিত তাঁর একটি বিখ্যাত ব্যঙ্গ কবিতা নিচে উদ্ধৃত হলো ঃ
দুইশো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন
বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা,
বাপান্ত শ্রমের ফলে উড়েছে আশার চামচিকা
উর্দু নীল আভিজাত্যে (জানে তা নিকট বন্ধুগণ)।
আতরাফ রক্তের গন্ধে দেখি আজ কে করে বমন?
খাঁটি শরাফতি নিতে ধরিয়াছি যে অজানা বুলি
তার দাপে চমকাবে একসাথে বেয়ারা ও কুলি
সঠিক পশ্চিমা ধাঁচে যে মুহূর্তে করিব তর্জন।
পূর্ণ মোগলাই ভাব তার সাথে দু’পুরুষ পরে
বাবরের বংশ দাবি-জানি তা অবশ্য সুকঠিন
কিন্তু কোন্ লাভ বল হাল ছেড়ে দিলে এ প্রহরে
আমার আবাদি গন্ধ নাকে পায় আজও অর্বাচীন;
পুর্বোক্ত তালাক সূত্রে শরাফতি করিব অর্জন;
নবাবী রক্তের ঝাঁজ আশা করি পাবে পুত্রগণ।।
(উর্দু বনাম বাংলা, মাসিক মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫২)

১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে সপরিবারে ঢাকায় এসে চাকুরির সন্ধানে ব্যাপৃত হন। বন্ধু সৈয়দ আলী আহসানের সহযোগিতায় তিনি ঢাকা বেতারে অনিয়মিত শিল্পী হিসাবে যোগ দেন। বেতারের প্রয়োজনে কবি নিয়মিত গান রচনা করেন। আধুনিক, দেশাত্মবোধক, হাম্দ-নাত প্রভৃতি গানের পাশাপাশি কথিকা, নাটিকা, গীতিনাট্য, গীতিনক্শা- এসবও রচনা করেন। বেতারে তিনি ছোটদের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘কিশোর মজলিশ’ পরিচালনা করেন। কিশোর মজলিশে অংশগ্রহণকারী এক ঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ তাঁর দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন ডকটর রফিকুল ইসলাম, ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ। পরবর্তীতে এঁরা সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন। এসময় কবির গদ্যনাটিকা ‘রাজরাজড়া’ প্রকাশিত (পরবর্তীকালে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী প্রমুখ এ নাটকে অভিনয় করেন)। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনোত্তরকালে ঢাকা বেতার কেন্দ্র নতুনভাবে সুসজ্জিত করা হয়। তখন অনেক কিছুরই অভাব ছিল। তার মধ্যে গীতিকারের অভাব ছিল প্রকট। বেতারের প্রয়োজনে তিনি এসময় অসংখ্য গান লেখেন এবং বেতারে তা যথারীতি প্রচারিত হয়। ফররুখের রচিত গানে সুরারোপ করেন বিশিষ্ট সুরকার আব্দুল আহাদ, ভাষাসৈনিক শিল্পী আব্দুল লতিফ, সমর দাস, বেদার উদ্দীন আহমদ, কাদের জামেরী প্রমুখ। তাঁর গানে কণ্ঠ দেন দেশের প্রখ্যাত বিভিন্ন শিল্পী। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন আব্দুল লতিফ, বেদার উদ্দীন আহমদ, লায়লা আরজুমান্দ বানু, ফেরদৌসী রহমান, মোস্তফা জামান আব্বাসী, ফৌজিয়া খান, আফসারী খানম, শামসুন্নাহার করিম, মাহবুবা রহমান, শবনম মুস্তারী প্রমুখ।
১৯৪৯ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ইকবাল-জয়ন্তী অনুষ্ঠান, তরুণ লেখকদের আমন্ত্রণ না করার প্রতিবাদে কবি অনুষ্ঠান বর্জন করেন।
১৯৫০ সালে ‘ইস্ট বেঙ্গল টেক্সট বুক কমিটি’ ফররুখ আহমদ রচিত ‘নয়া জামাত’ পাঠ্য গ্রন্থের ১ম ভাগ পঞ্চম শ্রেণি, ২য় ভাগ ষষ্ঠ শ্রেণি, ৩য় ভাগ সপ্তম শ্রেণি ও চতুর্থ ভাগ অষ্টম শ্রেণির জন্য পাঠ্য তালিকাভুক্ত করে। এসময় ফররুখের লেখা সাত সাগরের মাঝি, ডাহুক, সিন্দাবাদ, শ্রাবণের বৃষ্টি প্রভৃতি অমর কবিতা বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়।
১৯৫১ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্র কবিসহ পনেরো জন শিল্পীকে বেতারের চাকরি থেকে ছাঁটাই করে। প্রতিবাদে সকল বেতারশিল্পীগণ ১৭ দিনব্যাপী ধর্মঘট করে। ফলে কর্র্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কবিসহ সকল শিল্পীকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে।
১৯৫২ সালে ‘সিরাজাম মুনীরা’ প্রকাশিত হয়। কবি ঢাকা রেডিওর নিজস্ব শিল্পী হিসাবে বহাল হন। ভাষা-শহীদ সালাম, জব্বার, রফিক, শফিকের শাহাদতের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাইরে, ঢাকা বেতারেই প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। কবি তাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ সময় কবি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইসলামী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে যোগ দেন। ‘সিপাহী বিপ্লব’ শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান আয়োজনে কবির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এ-উপলক্ষে তিনি কবিতা ও গান রচনা করেন।
১৯৫৩ সালে ঢাকা বেতার থেকে কবির কাব্যনাট্য ‘নৌফেল ও হাতেম’ প্রচারিত হয়। এটি প্রযোজনা ও নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন খান আতাউর রহমান।
১৯৫৭ সালে কবির স্বপ্ন ছিল ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। উপরন্ত পাকিস্তানে ইসলাম বিরোধী নানা কর্মকান্ড, শোষণ-জুলুম-নির্যাতন-বৈষম্য-দুর্নীতি ইত্যাদি চলতে দেখে তিনি স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় গভীর মর্মজ্বালা অনুভব করেন। এ সময় তিনি অসংখ্য কবিতা ও ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করে তাঁর মনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁর ব্যঙ্গ কাব্য ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য, হাবেদা মরুর কাহিনী, তাসবীর নামা, টুকরো কবিতা, নসিহতনামা, রসরঙ্গ, অনুস্বার, রাজ-রাজড়া ব্যঙ্গ নাটক প্রভৃতি এসময়কার রচনা। কবিতার ভাষায় ছোরা তীক্ষè তীরের আঘাতে সরকার বিব্রত হয় এবং তাঁর পিছনে গোয়েন্দা লেলিয়ে দেয়। ফররুখ আহমদকে এসময় বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে চলতে হয়। নিজেকে আড়াল করার জন্য ফররুখ আহমদ তাঁর অধিকাংশ ব্যঙ্গকবিতা বিভিন্ন ছদ্মনামে প্রকাশ করেন। এসব ছদ্মনামের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো- হায়াত দারাজ খান পাকিস্তানী, ইয়ারবাজ খান, মুন্সী তেলেসমাত, কোরবান বয়াতী, গদাই পেটা হাজারী, ঘুঘুবাজ খান, মানিক পীর, সরফরাজ খান ইত্যাদি।
১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ লাভ করেন। এ বছরই বাংলা একাডেমী পুরস্কার (কবিতা) ও একাডেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। বাংলা একাডেমী উদ্যাপিত নাট্য-সপ্তাহে ‘নৌফেল ও হাতেম’ মঞ্চস্থ হয়।
১৯৬১ সালে কাব্যনাট্য ‘নৌফেল ও হাতেম’ প্রকাশিত হয়। এ সময়ে সরকারী সফরে উত্তর ও দক্ষিণ বাংলা সফর করেন। অধ্যাপক মুহম্মদ আব্দুল হাই-এর সভাপতিত্বে ঢাকা হলে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা-বাসরে কবিকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে ফররুখ সাহিত্য-প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেন সৈয়দ আলী আহসান, মুনীর চৌধুরী, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, শামসুল হুদা চৌধুরী। মানপত্র পাঠ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ফররুখের কবিতা আবৃত্তি করেন শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বদরুল হাসান, সালমা চৌধুরী ও শবনম মুশতারী। আব্দুল আহাদের পরিচালনায় ফররুখ-সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফরিদা ইয়াসমীন, আব্দুল লতিফ, আফসারী খানম, বিলকিস নাসিরুদ্দীন, রওশন আরা বেগম, ফজলে নিজামী প্রমুখ।
১৯৬৩ সালে ফররুখের ১০১টি সনেট সংবলিত ‘মুহূর্তের কবিতা’ প্রকাশিত হয়। এ বছরই ফারুক মাহমুদের সম্পাদনায় ছদ্মনামে লেখা কবির ব্যঙ্গ-কবিতার সংকলন ‘ধোলাই কাব্য’ প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরীতে ‘সাহিত্য সপ্তাহ’ উদ্যাপিত হয়। এতে চর্যাপদ থেকে ফররুখ আহমদের কবিতা পর্যন্ত আবৃত্তির আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ এতে অংশগ্রহণ করেন। কবির ‘ডাহুক’ কবিতা আবৃত্তি করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। কবি অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হলেও অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে থেকে কবিতার আবৃত্তি শোনেন এবং পরে রফিকুল ইসলামকে এজন্য মোবারকবাদ জানান। রফিকুল ইসলাম এতে বিশেষভাবে অভিভূত হন এবং পরবর্তীতে ‘অনন্য পুরষ্কার’ নামে এক প্রবন্ধে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এবছর ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে একটি শিশু-কিশোর সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্দেশ্যে কবি ফররুখ আহমদকে অনুরোধ করা হলে তিনি এর নাম দেন ‘শাহীন ফৌজ’। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন জনাব নুর মোহাম্মদ আকন (সাবেক সহকারী সচিব), পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান। ‘শাহীন ভাই’ নামে পরিচিত শামসুল হক ছিলেন এর কেন্দ্রীয় পরিচালক। নামকরণের সাথে সাথে তিনি সংগঠনের জন্য ‘শাহীন’ নামে একটি অসাধারণ কবিতাও লিখে দিয়েছিলেন।
১৯৬৫ সালে শিশু-কিশোর কবিতা সংকলন ‘পাখির বাসা’ প্রকাশিত হয়। পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি রচনা করেন ‘জঙ্গী জোয়ান চল বীর’, ‘শহীদের খুনরাঙা কাশ্মীর’, ‘জেহাদের ময়দানে চল যাই’ প্রভৃতি অসংখ্য উদ্দীপনামূলক গান। কবি এসময় কয়েকদিন পর্যন্ত বাসায় না এসে, খাওয়া-দাওয়া ভুলে দিন-রাত বেতার কেন্দ্রে অবস্থান করে এসব গান-কবিতা রচনা করেন।
১৯৬৬ সালে ‘হাতেম তা’য়ী’ প্রকাশিত হয়। এ বছর কবি তাঁর ‘পাখির বাসা’ কাব্যের জন্য ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’ ও ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যের জন্য ‘আদমজী পুরস্কার’ ও পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেন। কিন্তু শেষোক্ত খেতাবটি কবি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। শেষবারের মতো ঢাকার বাইরে, অগ্রজ সৈয়দ সিদ্দিকী আহমদের সঙ্গে দেখা করতে ফরিদপুরে যান। ফিরে এসে লেখেন ‘বৈশাখ’, ‘পদ্মা’, ‘আরিচা-পারঘাটে’ প্রভৃতি কবিতা। স্বৈরাচারী আইয়ুবী শাসনের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার-প্রদত্ত ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৬৮ সালে শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ‘হরফের ছড়া’ প্রকাশিত হয়।
১৯৬৯ সালে শিশু-কিশোর কাব্যগ্রন্থ ‘নতুন লেখা’ প্রকাশিত হয়। ডক্টর সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় প্রণীত গবেষণা গ্রন্থ ‘কবি ফররুখ আহমদ’ প্রকাশিত হয়। কবির উপর রচিত এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। এ গ্রন্থ রচনায় ডক্টর সুনীলকুমারের সহপাঠী কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্ তাঁকে বিশেষভাবে সহযোগিতা প্রদান ও উৎসাহ যোগান। গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যে ডক্টর সুনীল কুমার ফররুখ আহমদের ইস্কাটনের সরকারি কোয়ার্টারে দেখা করতে এলে কবির নিরহঙ্কার দারিদ্র্যপূর্ণ সাধারণ জীবন-যাপন পদ্ধতি দেখে বিস্মিত ও মুগ্ধ হন। প্রখ্যাত শিল্পী মোস্তফা আজীজ এ বছর (২৯ জুলাই) কবির একটি পোর্ট্রেট আঁকেন।
১৯৭০ সালে ছড়াগ্রন্থ ‘ছড়ার আসর’-১ম ভাগ প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ দুই দশকেরও অধিক কাল কবি ঢাকা বেতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ বছরই ঢাকা বেতারের মুখপত্র পাক্ষিক ‘এলানে’র (বর্তমান বেতার বাংলা) নভেম্বর (১ম পক্ষ) ১৯৭০ সংখ্যার প্রচ্ছদে কবির ছবি ও কবি প্রসঙ্গে আলোচনা গুরুত্বসহ ছাপা হয়।
১৯৭১ সালে কবি ঢাকা বেতারে শেষবারের মতো কবিতা আবৃত্তি করেন। এ বছর ডিসেম্বর মাসে কবিকে বেতারের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং তাঁর বেতন-ভাতা স্থগিত করা হয়। ফলে কবি আর্থিক দুরবস্থার সম্মুখীন হন। এগার ছেলেমেয়েসহ বিশাল পরিবারের জীবনধারণ দুর্বহ হয়ে ওঠে।
১৯৭৩ সালে এ বছর এপ্রিল মাসে কবির বড় মেয়ে সৈয়দা সামারুখ বানু অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। এসময় কবির বড় ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহিল মাহমুদ ৩য় বর্ষ এম.বি.বি.এস-এর ছাত্র ছিলেন। অর্থাভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ হয় এবং তিনি টেক্সট বুক বোর্ডে সামান্য চাকরি গ্রহণে বাধ্য হন। এ সময় এসময় ‘ফররুখ আহমদের কি অপরাধ’ (গণকণ্ঠ, ১ আষাঢ় ১৩৮০, ১৫ জুন ১৯৭৩) শীর্ষক তীব্র, তীক্ষè প্রতিবেদন লেখেন আহমদ ছফা। তিনি দারিদ্র্য-পীড়িত কবিকে সাহায্য করার জন্য একটি তহবিল গঠনেরও আহ্বান জানান। এ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা কেন্দ্রের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কবির চাকরি পুনর্বহাল করা হয়।
১৭ জুন ১৯৭৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কবি ফররুখ আহমদের দুরবস্থার বিষয় উল্লেখ করে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। এতে স্বাক্ষর করেন- ডক্টর আবু মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ্ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি), ডক্টর আহমেদ শরীফ (বাংলা), ডক্টর আনিসুর রহমান (অর্থনীতি), প্রফেসর নুর মোহাম্মদ মিয়া (জনপ্রশাসন), ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরাজি), প্রফেসর নাজমুল করিম (সমাজবিজ্ঞান), ডক্টর শাহ্ ফজলুর রহমান (পদার্থ বিজ্ঞান), ডক্টর আব্দুল জব্বার মিয়া (শিক্ষা ও গবেষণা), ডক্টর এস.এম.এ হক (গণিত), প্রফেসর মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন (আইন), ডক্টর ললিত মোহন নাথ (পদার্থবিজ্ঞান), লে. কর্নেল মতিউর রহমান (শরীরচর্চা), প্রফেসর আফসার উদ্দিন (সমাজবিজ্ঞান), প্রফেসর আব্দুল মজিদ খান (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি), ডক্টর আলী নওয়াব (রসায়ন), প্রফেসর খায়রুল বাশার (প্রাণিবিদ্যা), প্রফেসর ডক্টর এল. কবির (আইন), প্রফেসর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খান। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি চাকরিতে আর ফিরে যাননি এবং তাঁর পাওনা এক পয়সাও বুঝে পাননি।
এসময় কবিকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের আহ্বানে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির আহ্বায়ক হন জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সদস্য-সচিব হন অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান। কমিটিতে আরো ছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মাওলানা আলাউদ্দিন আল আজহারী, ডক্টর গোলাম মোয়াজ্জেম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, অধ্যাপক আবুল হোসেন প্রমুখ। কবিকে অর্থ সাহায্য প্রদানের জন্য কমিটি গঠনের কথা শুনে কবি অর্থ সাহায্য গ্রহণে তাঁর অনিচ্ছার কথা ব্যক্ত করায় কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়।
১৯৭৪ সালে কবির ¯েœহভাজন মুহম্মদ মতিউর রহমানের অনুরোধে শেষবারের মত স্বকণ্ঠে ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতা আবৃত্তি করেন। কবির বাসায় মাওলানা আলাউদ্দীন আল্-আযহারীর উপস্থিতিতে মুহম্মদ মতিউর রহমান আবৃত্তিটি টেপ করেন এবং সে বছর সীরাতুন্নবী অনুষ্ঠানে তা প্রচারের ব্যবস্থা করেন। এ সময় সামাজিক ও দৈনন্দিন নানাবিধ কারণে কবির মন ও শরীর ভেঙে যায়। এ বছর জুন মাসে (আষাঢ় ১৩১৮) কবি তাঁর সর্বশেষ কবিতা ঃ দুর্ভিক্ষ বিষয়ক কবিতা ‘১৯৭৪ (একটি আলেখ্য)’ লেখেন। এ ছাড়া লেখেন হাম্দ-নাত, গাদ্দাফী প্রাসঙ্গিক একগুচ্ছ কবিতা, তরজমা করেন আল-কোরআনের কিছু নির্বাচিত সূরা ও আয়াত এবং মাওলানা শফিউদ্দিন (দাদাজী)-কে নিবেদিত একটি দীর্ঘ উর্দু ক্বাসিদা। কবির সর্বশেষ লেখা সনেটটি নিচে উদ্ধৃত হলো-
১৯৭৪
(একটি আলেখ্য)
স্বপ্নের অধ্যায় শেষ। দুঃস্বপ্নের এ বন্দী শিবির
সাতকোটি মানুষের বধ্যভূমি। দেখ এ বাংলার
প্রতি গৃহে অপমৃত্যু ফেলে ছায়া তিক্ত হতাশার
দুর্ভিক্ষের বার্তা আসে। আসে মৃত্যু নিরন্ধ্র রাত্রির।
বাষট্টি হাজার গ্রাম উৎকণ্ঠিত, নিভৃত পল্লীর
প্রতি পথে ওঠে আজ হাহাকার তীব্র বুভুক্ষার
চোখে ভাসে চারদিকে অন্ধকার-কালো অন্ধকার।
ক্ষুধা, মৃত্যু ভাগ্য আজ স্তিমিত এ ভ্রান্ত জাতির।
এ মুহূর্তে কি উজ্জ্বলণ রাজধানী। নতুন শহর
অত্যুগ্র যৌবন-মদে মত্তা যেন নটিনী চঞ্চল,
কাটায় উল্লাসে তার জীবনের উদ্দাম প্রহর।
উপচিয়া পড়ে যায় পানপাত্র ফেনিল, উচ্ছল,
নির্লজ্জের রঙ্গমঞ্চে অকল্পিত বিলাসের ঘর,
দু’চোখ-ধাঁধানো রূপে; নগ্ন, মেকী ঐশ্বর্যে উজ্জ্বল।।
(১লা আষাঢ়, ১৩৮৯ বাংলা। ১০ জুন, ১৯৭৪ খ্রি: তারিখে লেখা।)

১৯ অক্টোবর, শনিবার, সন্ধ্যেবেলা (রমজান মাস) ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকায় ইন্তেকাল। কবির বন্ধু ও সুহৃদগণ প্রথমে চেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হল সংলগ্ন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম মুসা খানের মাজারের পাশে কবিকে কবরস্থ করতে। কিন্তু এতে সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় কবিবন্ধু কবি বেনজীর আহমদ তাঁর শাহজাহানপুরস্থ বাসস্থান ও মসজিদ সংলগ্ন আমবাগানে কবিকে কবরস্থ করার অনুরোধ জানান। অবশেষে তাঁকে সেখানেই কবরস্থ করা হয়। পরবর্তীকালে বেনজীর আহমদের মৃত্যুর পর তাঁর লাশও পাশাপাশি দাফন করা হয়। তাঁদের পাশে শুয়ে আছেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তি কবি বেনজির আহমদের একান্ত বন্ধু ও সুহৃদ ফজলুল হক শেলবর্ষী। কবি তিন কন্যা ও আট পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। যথাক্রমে তারা হলেন- সৈয়দা শামারুখ বানু (মৃত), সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আবদুল্লাহিল মাহমুদ (ডাক্তার), সৈয়দ আব্দুল্লাহিল মাসুদ (পশ্চিম জার্মানিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), সৈয়দ মনজুরে এলাহী, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান (কবি ও সাংবাদিক আহমদ আখতার), সৈয়দ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান (কর্মকর্তা, ইসলামি ব্যাংক), সৈয়দ মুখলিসুর রহমান (মৃত, মাসিক মদীনায় কর্মরত ছিলেন), সৈয়দ খলিলুর রহমান এবং সৈয়দ মুহাম্মদ আবদুহু (মৃত, সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন)।
কবির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে সাহায্য প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল ফজলের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ‘ফররুখ স্মৃতি তহবিল’ গঠিত হয়। স্মৃতি তহবিলের পক্ষ থেকে অর্থসাহায্য প্রদানসহ কবির গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ গৃহীত হয়। এ সম্পর্কে আবুল ফজলের লেখা একটি চিঠি নিচে উদ্ধৃত হলো-
সাহিত্য নিকেতন
১১০, নূর আহমদ সড়ক
চট্টগ্রাম।
২২ নভেম্বর, ১৯৭৪
বেগম কবি ফররুখ আহমদ,
আপনার স্বামী মরহুম কবি ফররুখ আহমদের অকাল-মৃত্যুর জন্য দেশের আরো বহুজনের মতো আমরাও অত্যন্ত মর্মাহত। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয়নি- এ অপরাধে আমরাও অপরাধী। তাঁর জন্য এখন দুঃখ অনুশোচনা করে লাভ নেই। কবি আজ এসবের অতীত। আমাদের বর্তমান দুর্ভাবনা আমরা কী করে আপনার ও আপনার ছেলেমেয়ের কিছুটা অন্তত দুঃখ লাঘব করতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমরা চট্টগ্রামে ‘ফররুখ স্মৃতি তহবিল’ নামে কিছু অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি, আমরা কতখানি সফল হলাম বলতে পারছি না। আপাতত হাজার পাঁচেক টাকা আমাদের তহবিলে সংগৃহীত হয়েছে। সে টাকাটার একটা ব্যাংক ড্রাফট (উবসধহফ উৎধভঃ-উউ) এ সঙ্গে পাঠাচ্ছি। প্রাপ্তি স্বীকার কররে বাধিত হবো। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকেও আপনাদের জন্য কিছু সরকারি সাহায্য বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়ে একখানা চিঠি লিখেছিলাম। তারা কিছু করছেন কিনা আজো জানতে পারি নাই। আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমরা আমাদের এ সাহায্যের কথা কাগজে প্রকাশ করতে চাই। তাহলে আমাদের বিশ্বাস এ অবহেলিত কবির অবদানের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে।
আপনার আর কবি-পরিবারের সকলের প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা। আল্লাহ্ আপনাদের মনোবল দিন।
বিনীত
আবুল ফজল

১৯৭৫ সালে ‘ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এ সম্পাদনা কাজে কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্, ফওজুল কবির খান (পরে ডক্টর ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব), কবিপুত্র আহমদ আখতারসহ অনেকেই তাঁকে সহযোগিতা করেন।
১৯৮০ সালে জুন মাসে বাংলা একাডেমী কর্তৃক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদ রচনাবলি’, ১ম খণ্ড প্রকাশিত।
১৯৮১ সালে জুন মাসে বাংলা একাডেমী কর্তৃক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদ রচনাবলি’, ২য় খণ্ড প্রকাশিত।
১৯৯৫ সালে জুন মাসে বাংলা একাডেমি কর্তৃক আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ রচনাবলী’, প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়।
১৯৯৬ সালে জুন মাসে বাংলা একাডেমী কর্তৃক আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ রচনাবলী’, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়।
১৯৯৮ সালে ঢাকায় অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান তাঁর কতিপয় সুহৃদ সহযোগে ‘ফররুখ একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ফররুখ চর্চার শুরু। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’ নামে রেজিস্ট্রিকৃত। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মুহম্মদ মতিউর রহমানের সম্পাদনায় প্রতি বছর কবির জন্ম ও মৃত্যুদিবস উপলক্ষ্যে ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’র দু’টি করে সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ২০০৮ সাল থেকে ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ প্রবর্তন করা হয়। এ যাবৎ এ পুরস্কার লাভ করেছেন ফররুখ-গবেষক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্-২০০৮, শাহবুদ্দীন আহমদ-২০০৯, ডক্টর সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়-২০১০, আব্দুল মান্নান সৈয়দ-২০১১, কবি আব্দুর রশিদ খান-২০১২, ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর-২০১৩ ও প্রফেসর ডক্টর সদরুদ্দিন আহমেদ-২০১৪।
২০০৮ সালে ঞযব ঊহমষরংয ঞৎধহংষধঃরড়হ ড়ভ ঝড়সব ঝবষবপঃবফ চড়বসং ড়ভ ঋধৎৎঁশয অযসধফ: ঞৎধহংষধঃবফ নু অনফঁৎ জধংযরফ কযধহ. চঁনষরংযবফ নু গঁযধসসধফ গধঃরঁৎ জধযসধহ, চৎবংরফবহঃ ঋধৎৎঁশয এধনবংযধহধ ঋড়ঁহফধঃরড়হ (ঋধৎৎঁশয জবংবধৎপয ঋড়ঁহফধঃরড়হ), ৬২/২১, চঁৎধহধ চধষঃধহ উযধশধ-১০০০.
২০১২ সালে ঞযব ঊহমষরংয ঞৎধহংষধঃরড়হ ড়ভ ঝড়সব ঝবষবপঃবফ চড়বসং ড়ভ ঋধৎৎঁশয অযসধফ (২হফ বফরঃরড়হ) : ঞৎধহংষধঃবফ নু অনফঁৎ জধংযরফ কযধহ. চঁনষরংযবফ নু গঁযধসসধফ গধঃরঁৎ জধযসধহ, চৎবংরফবহঃ ঋধৎৎঁশয এধনবংযধহধ ঋড়ঁহফধঃরড়হ (ঋধৎৎঁশয জবংবধৎপয ঋড়ঁহফধঃরড়হ), ৬২/২১, চঁৎধহধ চধষঃধহ উযধশধ-১০০০.
২০১৩ সালে ঞঐঊ ঝঅওখঙজ ঙঋ ঞঐঊ ঝঊঠঊঘ ঝঊঅঝ নু ঋঅজজটকঐ অঐগঅউ, ঞৎধহংষধঃবফ ভৎড়স ঃযব ইধহমষধ ‘ঝঅঞ ঝঅএঙজঊজ গঅঔঐও’ নু ণধংসরহ ঋধৎঁয়ঁব, চঁনষরংযবৎ : ঞৎধভভড়ৎফ চঁনষরংযরহম, ঘড়ৎঃয অসবৎরপধ ্ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ, টঝঅ, ২০১৩.
২০১৩ সালে অঈঈঙখঅউঊঝ নু ঋঅজজটকঐ অঐগঅউ, ঞৎধহংষধঃবফ ভৎড়স ঃযব ইধহমষধ ‘ঝওজঅঔঅগ গটঘওজঅ’ নু ণধংসরহ ঋধৎঁয়ঁব, চঁনষরংযবৎ : ঞৎধভভড়ৎফ চঁনষরংযরহম, ঘড়ৎঃয অসবৎরপধ ্ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ, টঝঅ, গধু ২০, ২০১৩.
২০১৫ সালে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও ফররুখ একাডেমি পত্রিকার সম্পাদক মুহম্মদ মতিউর রহমানের সম্পাদনায় ‘ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’-১ম খণ্ড (৬৫৬ পৃষ্ঠা) সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
২০১৭ সালে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও ফররুখ একাডেমি পত্রিকার সম্পাদক মুহম্মদ মতিউর রহমানের সম্পাদনায় ‘ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’-২য় খণ্ড (৩৪৫ পৃষ্ঠা) সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
২০১৭-১৮ সালে কবির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সভা-সেমিনার-গ্রন্থপ্রকাশ, ফররুখ একাডেমি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ ও ফররুখ সাহিত্যের চর্চা ও গবেষণার জন্য পুরস্কার প্রদান ইত্যাদি।

মরণোত্তর পুরস্কার
১৯৭৭- একুশে পদক।
১৯৭৮- স্বাধীনতা পুরস্কার।
১৯৭৯- ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার।
২০০০- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদ্যাপন কমিটি কর্তৃক অন্য নয়জন বিশিষ্ট ভাষা-সৈনিকের সাথে ‘ভাষা-সৈনিক সংবর্ধনা ও পুরস্কার (মরণোত্তর)’ প্রদান। ২০০০-২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে মুহম্মদ মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘ভাষাসৈনিক সংবর্ধনা স্মারক’-এ ফররুখ আহমদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নিবন্ধ প্রকাশিত। — মুহম্মদ মতিউর রহমান